তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির বন্ধুদের প্রতি

সংগ্রামী বন্ধুগণ,
বাংলাদেশের তেল-গ্যাস রক্ষার সংগ্রামে আপনাদের আন্তরিক ও সংগ্রামী ভূমিকার জন্য জানাই অভিনন্দন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই সংগ্রাম এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে এই সংগ্রাম অনেক ওঠা-নামার ভেতর দিয়ে সামনে এগিয়েছে। এই এগিয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে এই সংগ্রামের অনেকগুলো অর্জন রয়েছে। আপনাদের জানা থাকা সত্ত্বেও এখানে তার উল্লেখ করছি। এই আন্দোলন – (১) বাংলাদেশে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানীর লুণ্ঠন সম্পর্কে জনগণকে সাধ্যানুযায়ী সচেতন ও সতর্ক করেছে। (২) বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দল-আমলা-বুদ্ধিজীবী প্রভৃতির চরিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরায় ভূমিকা রেখেছে। (৩) জনগণকে নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সজাগ করেছে। (৪) দেশে বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের নামে লুণ্ঠনের চেহারা খুলে দিয়েছে। (৫) সরকার ও শাসক শ্রেণীর মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ বলয় তৈরী করেছে। (৬) জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে গ্যাস রফতানির চক্রান্ত রুখে দিয়েছে। (৭) ফুলবাড়ি কয়লা খনি লুণ্ঠনে এশিয়া এনার্জির চক্রান্ত প্রতিরোধ করেছে। (৮) নতুন প্রজন্মের ভেতর সংগ্রামের ডাক নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
বন্ধুগণ,
দীর্ঘ ১১ বছরের সংগ্রামে এ সকল অর্জনের পাশাপাশি এখন সময় এসেছে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন বিবেচনার।
(১) বাংলাদেশের স্থলভাগ ২৩টি ব্লকে ভাগ করে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর হাতে গত দেড় যুগ ধরে যে সব ব্লক অসম উৎপাদন বন্টন চুক্তির (পিএসসি) মাধ্যমে তুলে দেয়া হয়েছে সে সব উৎপাদন বন্টন চুক্তি বাতিলের লক্ষ্যে কোন বদ্ধপরিকর সংগ্রাম গত ১১ বছরে গড়ে তোলা যায় নি। এ সকল উৎপাদন বন্টন চুক্তিতে গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন-উৎপাদন ব্যয় বহুজাতিক কোম্পানি যা দাবি করছে তা-ই উত্তোলিত গ্যাস দিয়ে মেটাতে হয়। এছাড়া বাজারজাত যোগ্য গ্যাসের ৭৯ ভাগ মালিকানা বহুজাতিক কোম্পানির আর বাংলাদেশের মালিকানা ২১ ভাগ। যার পরিণতিতে আমরা নিজেদের গ্যাস বহুজাতিক কোম্পানির কাছ থেকে ডলারে দ্বিগুণ দামে কিনছি। আর বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার যোগান দিতে সরকার কিছু দিন পর পরই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সময় সময় গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। এই অসম উৎপাদন বন্টন চুক্তি বাতিল করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে।
(২) শাসক শ্রেণী ও তার সরকার জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির সাথে এসব চুক্তি করছে। সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব কমিশন খেয়ে জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে দিচ্ছে। এই লুটেরা দুর্নীতিবাজ শাসক শ্রেণী ও তার সরকারকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় রেখে দেশের সম্পদ রক্ষার সংগ্রাম সফল হতে পারে না। সুতরাং তেল-গ্যাস রক্ষার আন্দোলনকে এদের শ্রেণী শাসন উচ্ছেদের যে লক্ষ্য তার অধীনস্থ করতে হবে। রাজনৈতিক লক্ষ্যের প্রয়োজন নেই, আন্দোলনটাই বড় Ñ এই চিন্তার অধীনে থেকে আন্দোলন করলে অনেক আপাতঃ সাফল্য সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আন্দোলন থেকে শাসক শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদের কোন না কোন অংশ ফায়দা তুলে নেবে।
(৩) বাংলাদেশের তেল-গ্যাস ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানির লুণ্ঠনের পাশাপাশি গত ২০ বছরে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সোফা (ঝঙঋঅ) (১৯৯৮), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহায়তা চুক্তি (২০০৩), মার্কিন যুদ্ধাপরাধী রক্ষা চুক্তি (২০০৩), এমওআই (গড়ও) (২০০৪) প্রভৃতি সামরিক চুক্তি সম্পাদন করেছে। এসব চুক্তির ফলে যৌথ মহড়া, ত্রাণ তৎপরতা, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী প্রশিক্ষণ ইত্যাদির আড়ালে মার্কিন সৈন্যদের আগমন বৃদ্ধি পেতে পেতে বাংলাদেশে তাদের অবস্থান প্রায় স্থায়ী হতে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সমুদ্রে নৌ ঘাঁটি এবং চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রামে বিমান ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। এ সকল প্রশ্ন আজ তেল-গ্যাস রক্ষার আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। অথচ তেল-গ্যাস রক্ষার আন্দোলনকে একটি অর্থনৈতিক আন্দোলনের সীমানায় আটকে রাখার চেষ্টা আন্দোলনের নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এই আন্দোলনকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী-শাসক শ্রেণী বিরোধী সামগ্রিক রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে না দেখার বা না দেখানোর ফলে সংগ্রামের বিকাশ রুদ্ধ হয়ে আছে বলে আমরা মনে করি।
(৪) বাংলাদেশে গত ৩৮ বছরে সর্ববৃহৎ দুর্নীতিগুলো সংগঠিত হয়েছে তেল-গ্যাস সম্পদকে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া নিয়ে। এসবের মধ্যে রয়েছে:
(ক) সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের আমলে কাফকোর কাছে কম দামে গ্যাস বিক্রি করে আন্তর্জাতিক বাজার দরে তাদের কাছ থেকে সার কেনার চুক্তি।
(খ) কোন দরপত্র ছাড়াই আবি®কৃৃত জালালাবাদ গ্যাস ক্ষেত্র অক্সিডেন্টাল কোম্পানির কাছে লীজ প্রদান।
(গ) স্থলভাগে অবস্থিত জালালাবাদ গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রতি গঈঋ ৩.২৩ ডলার সর্বোচ্চ মূল্যে গ্যাস ক্রয় চুক্তি যা সাগরের সাঙ্গু গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত গ্যাসের সর্বোচ্চ মূল্যের (প্রতি গঈঋ ২.৭৭ ডলার) চেয়ে অনেক বেশি।
(ঘ) শেভ্রনের কাছ থেকে বেশি দামে (প্রতি গঈঋ ৩.২৩ ডলার) গ্যাস কিনে লাফার্জ সিমেন্ট কারখানার কাছে কম দামে (প্রতি গঈঋ ২.৮০ ডলার) বিক্রয়ের চুক্তি।
(ঙ) ফুলবাড়ি কয়লা ক্ষেত্র উন্নয়ন চুক্তি।
(চ) মাগুড়ছড়া গ্যাস ক্ষেত্রের বিস্ফোরণের ক্ষতিপূরণ না নেয়ার বদলে ৫% গ্যাস এর চুক্তি।
(ছ) শেভ্রনকে জালালাবাদ গ্যাস ক্ষেত্রের বাইরের এলাকায় গ্যাস অন্বেষণ ও উন্নয়নের অনুমতি প্রদান।
(জ) জিটিসিএল-এর কম্প্রেসার স্থাপনের আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিল করে কোন দরপত্র ছাড়াই শেভ্রনকে কাজটি করতে দেয়া। (আগস্ট ২০০৯)
(ঝ) পিএসসি-তে শতকরা ৮০ ভাগ গ্যাস রফতানির সুযোগ রেখে সমুদ্রের ৩টি ব্লক ইজারা প্রদান।
(্ঞ) এশিয়া এনার্জির অবৈধ ফুলবাড়ি কয়লা খনি প্রকল্প বৈধতা দিতে কয়লা নীতি প্রণয়ন।
উল্লিখিত দুর্নীতি করেছে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শাসক শ্রেণী ও তাদের সরকারগুলো। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্রের ৩টি গ্যাস ব্লক বহুজাতিক কোম্পানির হাতে উৎপাদন বন্টন চুক্তি মাধ্যমে তুলে দেয়ার যে দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছেন তাতে বোঝার অসুবিধা হয় না যে এর সাথে দুর্নীতির সম্পর্ক রয়েছে। মডেল পিএসসি ২০০৮ বাতিলের দাবি, সমুদ্রের ৩টি ব্লক ইজারা বাতিলের গণদাবিকে উপেক্ষা করার আর কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।
তেল-গ্যাস রক্ষার আন্দোলনে ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির প্রশ্ন আজ অত্যন্ত জোরের সাথে তুলতে হবে।
(৫) মার্কিন-ভারতের তাবেদার বর্তমান সরকারের সাথে গাঁটছড়ায় বাঁধা থেকে যে সব রাজনৈতিক দল তেল-গ্যাস আন্দোলনের মঞ্চে প্রকাশ্যে অবস্থান করে এবং যারা মঞ্চে সরকার বিরোধী বুলি কপচায় ও আন্দোলনের কথা বলে অথচ এই সব বুর্জোয়াদের পদলেহী সুবিধাবাদী বামপন্থী নামধারীদের সাথে খাপ খাইয়ে চলে তাদের উভয়ের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
(৬) তেল-গ্যাস রক্ষার সংগ্রাম একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন জনগণের সামনে না রেখে এ সংগ্রাম করার অর্থই হচ্ছে সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রশ্নকে বাতিল করে দেয়া। এর অর্থ ক্ষমতাসীন লুটেরা দুর্নীতিবাজ সন্ত্রাসী সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার শাসক শ্রেণীর শাসনকে রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ রাখা। এভাবে শাসক শ্রেণীর সরকারকে আঘাত না করা হবে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। আমরা তাই মনে করি, তেল-গ্যাস রক্ষার আন্দোলনকে অর্থনৈতিক আন্দোলনের গন্ডির ভেতর থেকে বের করে এনে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সংগ্রামের সাথে একে যুক্ত করতে হবে। এই সংগ্রামকে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করবার দিকে পরিচালিত করতে হবে।
(৭) বিপুল আত্মত্যাগ সত্ত্বেও অতীতে এদেশের বহু আন্দোলনের ফসল শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী জনগণের ঘরে ওঠে নি। ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নটি, জনগণের হাতে ক্ষমতার প্রশ্নটি উপেক্ষা ও বাতিল করা এর অন্যতম কারণ। বুর্জোয়ারা আন্দোলন করে রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে। ফলে জনগণের হাতে ক্ষমতার প্রশ্নটি আন্দোলনের সামনে অনুপস্থিত থাকায় জনগণ রাজনৈতিকভাবে বুর্জোয়াদের অধীনস্থই থেকে গিয়েছেন। এটা ঘটেছে নেতৃত্বের সুবিধাবাদী চরিত্রের জন্য। এভাবে বার বার বিজয় হাতছাড়া হয়ে লুটেরা শ্রেণীর হাতে চলে গিয়েছে। জনগণ যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন।
(৮) জাতীয় ভিত্তিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁটছড়া বাধা শাসক শ্রেণী বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রাম বিকশিত করার ক্ষেত্রে তেল-গ্যাস সম্পদ লুণ্ঠনের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। এই অস্ত্রকে বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করবার শর্ত তৈরীর কাজে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে একটি অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের সকল আয়োজন সম্পন্ন করতে হবে। এভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নটিকে সুনির্দিষ্টভাবে মীমাংসা করেই দেশে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ রক্ষার আন্দোলন করতে হবে।
আসুন, জাতীয় রাজনীতিতে মূল ধারা হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতৃত্বাধীন বুর্জোয়া রাজনীতির ধারাকে পরাজিত করতে আগামী দিনে সংগ্রামের ভেতর দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-নিপীড়িত জাতি ও জনগণের রাজনীতির ধারাকে শক্তিশালী করি ও তাকে বিজয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই।
জনগণের ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম বিজয় লাভ করুক!
দুনিয়ার মজদুর এক হও!
ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
২৩/১০/২০০৯

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: