বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালসহ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালের বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারিকরণ রুখে দাঁড়ান

 সংগ্রামী দেশবাসী,

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) গত ১লা অক্টোবর থেকে বিকেল ৩টা হতে ৫টা পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ২০০ টাকা ফি নিয়ে রোগী দেখা শুরু করেছেন। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারিকরণের সরকারি চক্রান্ত পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সরকার গত বছর দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে কতগুলো আইটেমের উপর ইউজার ফি নির্ধারণ করেছে। এর মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যে সব অধিকার ছিল তা কেড়ে নেয়া হয়েছে। আর তা করা হয়েছে স্বাস্থ্যসেবার মান ‘উন্নয়নের’ নামে। এর ফলে শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী জনগণ বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হলো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার ‘অর্থের বিনিময়ে সরকারি চিকিৎসা’র এই নীতি বাস্তবায়ন করে প্রমাণ করেছে তারা পুঁজিপতি-ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষাকারী ও গণবিরোধী। ১৯৮০-র দশকে সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সরকার সরকারি হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে টিকেট কেটে রোগী দেখার সূচনা করেছিল। পরবর্তীতে সমগ্র রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সেবা খাতকে বেসরকারিকরণের ও বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে এরশাদ সরকার এক স্বাস্থ্যনীতি তৈরি করে। দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এর আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে এই গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল করতে সরকার বাধ্য হয়। এর কিছুদিন পরেই এক গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এর পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সকল সংসদীয় বেসামরিক সরকারই সামরিক শাসক এরশাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্রমশঃ জনগণের বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকারকে সঙ্কুচিত করে এসেছে।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-উপদেষ্টা এবং সরকারি আমলা, জজ সাহেব, সামরিক বাহিনীর অফিসাররা সরকারি অর্থে দেশে ও বিদেশে চিকিৎসা করে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন। এই ব্যয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে করা হচ্ছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তারা আরাম-আয়েশ-বিলাস-বিদেশ ভ্রমণ করেন। এছাড়া সামরিক খাতসহ বিভিন্ন অনুৎপাদক খাতে প্রতি বছর জনগণের ট্যাক্সের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। অথচ জনগণের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া হয় না। স্বাস্থ্যখাতে মাথা পিছু সরকারি ব্যয় বরাদ্দ বছরে মাত্র ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা অথচ ন্যূনতম চিকিৎসার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ মতে এটা হওয়া উচিত ২,৩৮০ টাকা (২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী)। বর্তমানে দেশে সরকারি হাসপাতালে মাত্র ৩৫ হাজার বেড রয়েছে যেখানে প্রয়োজন ৫ লাখ বেড। এক হিসেবে গড়ে ২৫ লাখ মানুষের জন্য রয়েছেন মাত্র একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার । এ রকম পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত চিকিৎসার নামে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ফি নিয়ে রোগী দেখা শুরু করেছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার প্রথম সরকার আইপিজিএমআর-কে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে রূপান্তরিত করে টিকিটের মাধ্যমে রোগী দেখার কর্মসূচি চালু করে এবং পুরাতন রেফার্ড সিস্টেম বাতিল করে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালকে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নিয়েই এই হাসপাতালে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের নিকট থেকে অর্থ আদায় প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এরপর একে একে সকল সরকারি হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালেও একইভাবে রোগীর নিকট থেকে অর্থ আদায় শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ডাঃ প্রাণগোপাল দত্ত ‘কম খরচে সেবা দেওয়া’র কথা বলে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে বাণিজ্যিকীকরণ ও পর্যায়ক্রমে বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছেন। এ প্রাণঘাতি পরিকল্পনা হাসিনা সরকারের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতিরই অংশ। সরকার বিশ্ব ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত সকল সেবা খাত থেকে একে একে বরাদ্দ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চক্রান্ত করছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই চক্রান্তের একটি উদ্দেশ্য হলো মুনাফালোভী প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ ফি আদায়কে ন্যায্যতা দেয়া, তাদের মুনাফার বৃদ্ধি ঘটানো; অন্য উদ্দেশ্য হলো ‘কম খরচে বিশেষায়িত চিকিৎসা’ চালুর মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসকের পরামর্শ সেবা পাওয়ার অধিকারকে উচ্ছেদ করা। সরকারি নীতি অনুসারেই বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রভৃতি বৃদ্ধি করে দেশে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের বিপুল ঘাটতি পূরণ করার কাজে মনোযোগ না দিয়ে এই বিশেষায়িত হাসপাতালকে মুনাফালোভী করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে ক্রমশঃ ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস চালু করে হাসপাতালগুলোকে ক্রমান্বয়ে বেসরকারিকরণ করা হবে।

বন্ধুগণ,

আমাদের দাবি,

* অবিলম্বে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে বৈকালিক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ সেবা বিনামূল্যে করতে হবে; কোনো প্রকার ফি নেয়া চলবে না। সরকারি হাসপাতালে ইউজার ফি নেয়া বন্ধ করতে হবে। শ্রমিক কৃষকসহ সকলকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

* গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা বিস্তারে প্রতিটি উপজেলায় ২০০ বেডের হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারসহ পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ, চিকিৎসার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

* বিশেষায়িত হাসপাতালে ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে তাদের নন-প্র্যাকটিস ভাতা দিতে হবে। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। *প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবার মান ও দাম নিয়ন্ত্রণে এবং কমিশন ব্যবসা, দুর্নীতি ও রোগীদের হয়রানি বন্ধে আইন প্রণয়ন করতে হবে। চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

*ঔষধের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। জনগণের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

*সরকারি হাসপাতালকে বেসরকারিকরণের নীতি বাতিল করতে হবে। এনজিওদের হাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তুলে দেয়ার সকল প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বিশ্ব ব্যাংকের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

*গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল করতে হবে। সামরিক খাতসহ অনুৎপাদক খাতে বরাদ্দ হ্রাস করে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।

* সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা জনগণের অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর অতিক্রান্ত হলেও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই জনগণকেই করতে হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সরকারি সিদ্ধান্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রুখে দাঁড়িয়েছে। সারা দুনিয়া জুড়ে, দেশে দেশে জনগণ নিজ অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমেছেন। গ্রীস, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড প্রভৃতি পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে যেমন, তেমনি তিউনিশিয়ায়, মিশরসহ আরব বিশ্বে রাজপথে জনগণ নিজ দাবি আদায়ে লড়ছেন। খোদ সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ মানুষ রাজপথে শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান কর্মসংস্থানের দাবিতে শহরের পরে শহরে সরকারি অফিস ও পুঁজিপতিদের কেন্দ্র ঘেরাও করে চলেছেন। আসুন, বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত-বঞ্চিত-অপমানিত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হই। আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে সরকার গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হবে। শোষক-শাসক শ্রেণী ও শোষণমূলক দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে জনগণের হাতে ক্ষমতা আনা, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের সরকার, শাসন ব্যবস্থা ও সংবিধান প্রতিষ্ঠা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনের সংগ্রাম বেগবান করতে, আসুন, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাসেবা খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারিকরণের ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়াই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: