‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আর ‘ইসলাম রক্ষার’ আওয়াজ তুলে শোষণ-নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা রক্ষার ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করুন

বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। মিথ্যার যেসব মূর্তি গড়ে গত ৪২ বছর ধরে এদেশের শোষক-শাসকশ্রেণী জনগণকে বিভ্রান্ত করে আসছিল তা’ আজ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। জনগণের উপর শোষক-শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আধিপত্য আজ প্রশ্নের সম্মুখীন।
সময় এসেছে শোষকশ্রেণীর ক্ষমতাসীন সরকার ও ক্ষমতাবহির্ভূত সকল অংশের মুখোশ খুলে দেয়ার। সময় এসেছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আর ‘ইসলাম রক্ষার’ আওয়াজ তুলে গত ৪২ বছর ধরে যে শোষক-শাসকশ্রেণী এদেশের শ্রমিক কৃষকসহ ব্যাপক জনগণের এবং ধর্মীয়, ভাষাগত, জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণের উপর শোষণ লুণ্ঠন নির্যাতন বলবৎ রেখে এসেছে তা উন্মোচন করার। এই কাজ করতে এগিয়ে আসতে হবে তরুণ প্রজন্মকে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কেন স্বাধীনতা উত্তর সরকার করে নি, গত ৪২ বছরে কেন এই বিচার হয় নি এ প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে। উঠে আসছে আরো বহু প্রশ্ন। কাদের স্বার্থ রক্ষায় যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সামরিক অফিসারকে বিনা বিচারে পাকিস্তানে ফেরত যেতে দেয়া হয়েছিল? কেন শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসীকে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলী ভুলে যেতে বলেছিলেন? কেন তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগী রাজাকার-আলবদর-আল শামস্কে সাধারণ ক্ষমা করেছিলেন? কেন তিনি দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের ১৯৭৩ সালেই মুক্তি দিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন? কাদের স্বার্থে ১৯৭৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর দালাল আটক আইন বাতিল করা হয়েছিল? কেন জেনারেল জিয়া ৩০ হাজার বামপন্থী-বিপ্লবী নেতা-কর্মীদের হত্যাকারী আওয়ামী-বাকশালীদের বিচারের সম্মুখীন করেন নি? কেন পঞ্চম সংশোধনী করে জেনারেল জিয়া সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ্’ যুক্ত করেছিলেন? শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের রক্ষা করেছিলেন? ১৯৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীতাকারী শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে ছিলেন? দেশপ্রেমিক কর্ণেল তাহেরকে প্রহসনের বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন? এসব বহু প্রশ্নের উত্তর আজ তরুণ প্রজন্মকে খুঁজে বের করতে হবে।
১৯৮২ সালে সামরিক ক্যু’দেতা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা জেনারেল এরশাদ এসেই বলেছিলেন, একুশে ফেব্র“য়ারীতে শহীদ মিনারে আল্পনা আঁকা অনৈসলামিক কাজ। কুখ্যাত মজিদ খানের শিক্ষানীতি বিরোধী মিছিলে গুলি করে ছাত্র হত্যাকারী জেনারেল এরশাদ অষ্টম সংশোধনী করে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছিল। এ সময়ে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের অনেক নেতা-কর্মীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল ইসলামী ছাত্র শিবিরের সন্ত্রাসীরা। আজ প্রশ্ন তুলতে হবে যে, কেন সে সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট ও লেজুড়বৃত্তিকারী ৫ দলীয় বাম জোট জামায়াতে ইসলামীর সাথে লিয়াজোঁ করে আন্দোলনের কর্মসূচী গ্রহণ করতো?
আজ দেশের দূর্যোগপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের পেছনের দিকে তাকাতে হবে। অতীতকে পর্যালোচনা না করে, অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে কেউ উন্নততর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না।
১৯৯২ সালে প্রধানতঃ ৭ নম্বর সেক্টর কমাণ্ডার কর্ণেল (অবঃ) কাজী নূরউজ্জামানের উদ্যোগে ও পরবর্তীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের বিচারের দাবীতে গণআদালত আন্দোলন গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ এক পর্যায়ে এই আন্দোলনে যোগ দেয় এবং একে নিয়ন্ত্রণ করে নিজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে কাজে লাগায়। তারা একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে আন্দোলনের মঞ্চ নিয়ন্ত্রণ করে এবং জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী ও এরশাদের জাতীয় পার্টির সাথে হাত মিলিয়ে চলে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। সংসদে তারা জামায়াতকে ২টি মহিলা আসন দেয়। প্রশ্ন তোলা দরকার কেন ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করে নি? কেন বিএনপি ২০০১ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের মন্ত্রী বানিয়েছিল? মনে রাখা দরকার, ২০০৬ সালে নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিসের সাথে ব্লাসফেমী আইন করতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল।
বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করে। গত ৪ বছরে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এই সরকার চিহ্নিত করেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করার কর্মসূচী হিসেবে, যা ছিল সরকারের নির্লজ্জ মিথ্যাচার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দুর্বল আইনজীবী নিয়োগ করে, আইনের ফাঁক-ফোকর রেখে সরকার জামায়াতের সাথে হাত মিলিয়েছে। গণহত্যাকারী কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ শাস্তি না দেয়া এর প্রশ্নাতীত প্রমাণ। সরকার-জামায়াত আঁতাত জনগণের কাছে পড়ে গেলে ঢাকার শাহবাগ চত্বরে প্রতিবাদী তরুণদের এক বিক্ষোভ জমতে থাকে। এই বিক্ষোভ যাতে সরকারের বিরুদ্ধে না যায় সে জন্য সরকারের পদলেহী বামপন্থী কমিউনিস্ট নামধারীরা, সরকারের গৃহপালিত উগ্রজাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতির পাণ্ডারা শাহবাগ চত্বরের মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। জনবিচ্ছিন্ন দুর্নীতিবাজ পতনোন্মুখ হাসিনা সরকারের কর্মসূচী বাস্তবায়নে গণজাগরণ মঞ্চের সম্পর্ক রয়েছে এ ধারণা স্পষ্ট হতে শুরু করার সাথে সাথে স্বতঃস্ফূর্ত জনগণ নিজেদের গুটিয়ে ফেলতে শুরু করে।
অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। স্বাধীনতা যুদ্ধে গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবী সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবীর সাথে যুক্ত। একদিকে জামায়াতের সাথে আঁতাত ও সেটাকে ধামাচাপা দিতে সরকারের নানামুখী তৎপরতায় সমগ্র বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছে। যা জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দিয়েছে। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় জামাত-শিবির দেশময় সহিংস হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হাসিনা সরকার পুলিশ দিয়ে গুলি করে দেড় শতাধিক নাগরিককে হত্যা করেছে, শত সহস্র ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ-আহত করেছে, হাজার হাজার মানুষকে জেলে ঢুকিয়েছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা রাতের আঁধারে হিন্দুদের মন্দিরে হামলা করেছে, মূর্তি ভেঙেছে, আগুন দিয়েছে। সরকার এই দুর্বৃত্তদের ধরতে পারেনি এবং এ সকল ঘটনা তদন্তে বিভিন্ন মহলের দাবি থাকলেও কোন তদন্ত কমিটি গঠন করেনি। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইসলাম ধর্মের অবমাননার প্রশ্ন তুলে চট্টগ্রামভিত্তিক ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামধারী সংগঠন সম্প্রতি ১৩ দফা দাবী তুলে নারী সমাজের পায়ে শেকল পড়াবার ঘোষণা দিয়েছে।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ন্যায়সঙ্গত দাবির ভিত্তিতে যে আন্দোলন প্রাথমিকভাবে ঢাকার শাহবাগ চত্বরে শুরু হয়েছিল, সে আন্দোলনকে বিপথে চালিত করে এখন ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াতে ইসলামী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগ তাদের নিজ নিজ ঘরানার সংগঠন ও ব্যক্তিদের শাসক শ্রেণীর অংশ হিসেবে ব্যবহার করে যে জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে তাতে দেশজুড়ে তারা উভয়পক্ষই পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে জোরদার করার খেলাতেই নিযুক্ত আছে। বাংলাদেশের জনগণকে তারা একদিকে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ এবং অন্যদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদের মধ্যে আটকে রাখতে চাইছে। শাসক শ্রেণীর এই দুই অংশ তাই আপাতদৃষ্টিতে যতই পরস্পরবিরোধী হোক, শ্রেণীভাই হিসেবে এরা উভয়েই জনগণের সব ধরনের স্বার্থের বিরোধী। এদের উভয়ের রাজনীতিই বাংলাদেশে জনগণের গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে সব থেকে মারাত্মক ও বিপজ্জনক প্রতিবন্ধক। বাংলাদেশে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশের পথে শক্তিশালী বাধা। গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন শক্তিশালী করে ফ্যাসিস্ট শাসক শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটানা সংগ্রাম পরিচালনাই এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র পথ।
আমরা দেশবাসীকে শাসক-শোষক শ্রেণীর রাজনীতি থেকে বের হয়ে এসে শ্রমিক কৃষক ধর্মীয় জাতিগত ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগণের সার্বিক মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিতে আহ্বান জানাই। বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থায় জনগণের হাতে ক্ষমতা আসবে না। জনগণের হাতে ক্ষমতা আসতে পারে, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হতে পারে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে দেশব্যাপী গণ-রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পথ ধরে। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল ১৮ দফা কর্মসূচী বাস্তবায়নে, জনগণের সরকার-সংবিধান-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়, সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এই সংগ্রামকে বেগবান ও শক্তিশালী করুন।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
কেন্দ্রীয় কার্যালয়: ৩১ তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা (৪/জি, ৫ তলা), ঢাকা ১০০০। ফোন: ০১৭১৩০৬৩৭৭৬।             ১৬/৪/২০১৩

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: