পুজিবাদের স্বার্থ রক্ষায় ৫ বাম দলের কর্মসূচী – হাসিবুর রহমান

[এখানে ৫ বাম দল নামক যে রাজনৈতিক জোটটির কর্মসূচি পর্যালোচনা করা হয়েছে সেই জোটটি আর নেই, আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে মিলে তারা গঠন করেছে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। তবে বাস্তব রাজনৈতিক কর্মকান্ডের দিক থেকে ৫ বাম দল ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। বলা চলে, এ হলো নতুন বোতলে পুরনো মদ। পর্যালোচনাটি ২০০৬ সালে তৈরী করা হলেও এর প্রয়োজন তাই ফুরিয়ে যায় নি। কিছুটা পরিমার্জন করে হাজির করা হলো।]

৩ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে একটি সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ৫ বাম দল তাদের ৭ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।

জাতীয় গণফ্রন্ট, বিপ্লবী ঐক্য ফ্রন্ট, গণসংহতি আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি এই চারটি দল মিলে ২০০২ সালে ৪ বাম দল নামে একটি জোট গঠন করে। অন্তর্ভুক্ত দলগুলির সংখ্যা গুণে রাজনৈতিক জোটের নামকরণ অবশ্য নতুন নয়। আশীর দশকে বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ও ৭ দল এই দুটি জোটে বামপন্থীদের প্রধান প্রধান সবকটি দলই অন্তর্ভুক্ত ছিল। সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাসদ (খালেকুজ্জামান), বাসদ (মাহবুব), শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল এরা ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দলে। ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ (এখনকার জাতীয় গণফ্রন্টের পূর্বসূরী) ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলে। ১৯৮৬-র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৫ দল ভেঙে গিয়ে জাসদ, দুই বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও  শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল ৫ দল নামে বামপন্থীদের ‘নিজস্ব’ রাজনৈতিক জোট গঠন করে। ৫ দল বামপন্থীদের জোট হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করে। ৯০ দশকের শেষার্ধে বামগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এর উদ্যোগে গণফোরাম, গণতন্ত্রী পার্টি ইত্যাদি মিলে গঠন করা হয় ১১ দল। আর ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ এই ১১ দলকে হজম করে নিয়ে গঠন করে ১৪ দলীয় জোট। সুতরাং দল গুণে জোটের নামকরণের এই অদ্ভূত কায়দাটা এদেশে বুর্জোয়াদেরই আবিষ্কার। এতে করে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের সাথে ‘কমিউনিস্ট’ ‘সমাজতন্ত্রী’ বা ‘শ্রমিক’ পার্টিসমূহের ঐক্যে মস্ত সুবিধাই হয়।

৪ বাম দলের সাথে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মাহবুব) যোগ দিলে জোটটির নতুন নামকরণ করা হয় ৫ বাম দল। জোটের নামকরণের ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের অনুকরণ ছাড়াও অতীতের ৫ দলের সক্রিয়তার যে স্মৃতিটুকু রাজনৈতিক কর্মী মহল ও মিডিয়ায় অবশিষ্ট রয়েছে তা অবলম্বন করে সেই স্থানটি অধিকার করে নেবার প্রচ্ছন্ন প্রয়াস যে এতে ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।

৫ বাম দল হচ্ছে এমন কতকগুলি সংগঠনের একটি জোট যাদের অধিকাংশেরই কোন ঘোষিত কর্মসূচি নেই। জোট গঠনের প্রায় ৪ বছর পর এর কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে। কর্মসূচিবিহীন সংগঠনগুলি এবার একটি কর্মসূচি পেল। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হলো জোট নিজেই পার্টির মতো আচরণ করতে চাইবে। জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদ হয়ে উঠতে চাইবে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি। এখন হয় জোটভুক্ত সংগঠনগুলি এর বিরোধিতা করুক সেক্ষেত্রে ৫ বাম দল হবে একটি নিষ্ক্রীয় জোট, নয়তো সবাই এর অধীনতা স্বীকার করুক সেক্ষেত্রে ৫ বাম দল ক্রমেই একক পার্টির মতো বিকশিত হবে।

‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার আশু রূপরেখা’ শিরোনামের ৫ বাম দলের কর্মসূচির শুরুতে রয়েছে ১৩টি প্যারাগ্রাফের একটি মুখবন্ধ, এর পর রয়েছে ৭ দফা কর্মসূচি। পর্যালোচনাকালে পাঠকদের সুবিধার্থে উদ্ধৃত প্যারাগ্রাফগুলোকে প্যারা চিহ্ন (§) ও সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবের পথ পরিস্কার করা।

১.বিপ্লব নয়, নির্বাচনের সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরীই লক্ষ্য

কর্মসূচির মুখবন্ধে ৫ বাম দল এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, বর্তমানে নির্বাচন যে শর্তের অধীন হয়েছে তাতে এর দ্বারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন সম্ভব নয়। ১৩টি প্যারার মুখবন্ধের দ্বাদশ প্যারায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছার পর তারা কী ঠিক করলেন? তারা ঠিক করলেন ‘শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি শ্রেণী, দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী’ মিলে এমনভাবে আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে যাতে করে ‘সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরিবেশ’ তৈরী হয়। অর্থাৎ ৫ বাম দলের মূল লক্ষ্য মোটেই রাষ্ট্র ও সমাজে কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন নয়, শাসক-শোষক শ্রেণীকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী শ্রেণী সমূহের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে আসা নয়, তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচনের একটি সুুবিধাজনক পরিবেশ তৈরী করা। এই পরিবেশ তৈরী করার জন্য ‘শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি শ্রেণী’-কে হাত মেলাতে হবে ‘দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী’-অর্থাৎ বুর্জোয়াদেরই সাথে। ৫ বাম দলের মিত্র ‘দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী’ নিয়ে আমরা খানিক পরেই আলোচনা করবো। আপাততঃ দেখা যাক তাদের কর্মসূচিতে নির্বাচনের সুুবিধাজনক পরিবেশ তৈরীর এই লাইন কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

আগেই বলা হয়েছে কর্মসূচির মুখবন্ধে মোট ১৩ টি প্যারা আছে। এর মধ্যে §৩ থেকে §৮ ও §১০ এই ৭টি প্যারা, অর্থাৎ মুখবন্ধের অর্ধেকের বেশী ব্যয় করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সরকার বিরোধী আন্দোলন ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের ২৩ দফা কর্মসূচির সমালোচনায়।

মূল সমালোচনাগুলো হলো:

§৩. ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে এই দাবির কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নাই।’ তাদের রাজনীতি বা কর্মসূচি ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ধারণ করে না’।

§৪. আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ঘোষিত ২৩-দফায় ‘দেশের সম্পদ ও উৎপাদন ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের আওয়াজ তোলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিভাবে এই স্বার্থ সংরক্ষিত হবে তার ন্যূনতম কোনো রূপরেখা নাই’।

§৫. ‘বোমা হামলা ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে হৈ হল্লাও বাগাড়ম্বরের বেশি কিছু হতে পারে নি।’

§৬. আওয়ামী লীগের ‘সংবিধান সমুন্নত’ রাখার ঘোষণা ‘ফাঁকা আওয়াজ’। কেননা বিদ্যমান সংবিধান ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থ উপযোগী’ নয়।

§৭. ‘কারচুপিহীন নির্বাচন হলেই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হবে, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যাবে’ আওয়ামী লীগের এই দাবি ‘অচল’।

§৮. ‘শাসক শ্রেণীর দলগুলির গোষ্ঠিগত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কুৎসিত প্রতিযোগিতা’ তাদের ‘শাসন ব্যবস্থা ও শ্রেণীস্বার্থকেও হুমকীর সম্মুখীন করে তোলে’। ‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচনী সংস্কারের প্রস্তাবে এই ব্যবস্থা থেকে উত্তরণের কোন উপাদান নাই।’

§১০. সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী নির্বাচন হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেও ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার ন্যূনতম কোন সম্ভাবনা নাই’। কেননা ‘আওয়ামী লীগের মধ্যে যে গোষ্ঠিটি চালিকা শক্তি তারা বিএনপি জোটের মতই সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত মার্কিন-ভারত অক্ষশক্তির পরিপূর্ণ তাবেদার’।

দেখাই যাচ্ছে যে, বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। সামান্য এদিক ওদিক করে এটিকে ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, বাসদ ইত্যাদি যে কোন দলের নামেই চালিয়ে দেয়া যায়। নিজেদের রণনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণার সময় আওয়ামী লীগের এই সমালোচনার প্রয়োজন হলো কেন ৫ বাম দলের? স্পষ্টতই ৫ বাম দল আওয়ামী লীগকে শ্রেণীগত শত্র“ হিসেবে দেখে না, দেখে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। আর তাই আওয়ামী লীগের ২৩ দফা কর্মসূচির বিপরীতে ৫ বাম দলের ৭ দফা কর্মসূচির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্যই মুখবন্ধে আওয়ামী লীগ ও ২৩ দফার সমালোচনা করা হয়েছে।

এভাবে তৈরী মুখবন্ধের পর যে কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে তার প্রথম দফাতেই ৫ বাম দল ঘোষণা করেছে: “একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বাস্তব পরিস্থিতি ও পরিবেশ তৈরীর জন্য” জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে “সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগী লুটেরা শাসকশ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী বিদ্যমান রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইন, লুটেরা মাফিয়া সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর সকল ক্ষমতা অপসারণ”, “অস্থায়ী বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা” এবং “তার নেতৃত্বে সংবিধান সভার নির্বাচন”।

‘সত্যিকার গণতান্ত্রিক’ নির্বাচন! সত্যিই!

এই নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টিতে তারা এতটাই সিরিয়াস যে “ন্যূনতম খরচে নির্বাচন অনুষ্ঠানের” কর্মসূচিও একই সাথে ঘোষিত হয়েছে।

নির্বাচনে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রশ্নটি বর্তমান মুহূর্তে শুধু তাদের কাছেই প্রাসঙ্গিক যারা বুর্জোয়াদের নির্বাচনী ব্যয়ের সাথে পাল্লা দিতে অক্ষম এবং অন্য কিছুর কথা বাদ দিলেও শুধু এই একটি কারণেই বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা যাদের প্রায় শূন্য। অর্থাৎ নির্বাচনী ব্যয়ের প্রশ্নটি শুধু মাত্র বুর্জোয়া নির্বাচনী ব্যবস্থাতেই প্রাসঙ্গিক, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে একটি বিপ্লবের পর নির্বাচনী ব্যয়ের প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক ও অবান্তর হয়ে পড়ে। যেহেতু ৫ বাম দলের লক্ষ্য নির্বাচনের সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরী, বিপ্লব নয়, তাই সস্তায় নির্বাচনের কর্মসূচি ঘোষণার সময় ৫ বাম দল ধরেই নিয়েছে যে ‘লুটেরা মাফিয়া সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর সকল ক্ষমতা অপসারণ’ করা হলেও টাকার থলেটা তাদের হাতে রয়ে যাবে। আর ‘অস্থায়ী বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সরকারের’ অধীনে নির্বাচনেও টাকাওয়ালাদের সাথেই তাদের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

৫ বাম দলের ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার আশু রূপরেখা’-র শিরোনামটি পাল্টে ‘সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরীর আশু রূপরেখা’ দিলেই যথার্থ হতো।

২. ৫ বাম দল যেভাবে বুর্জোয়াদের সহযোগী

মুখবন্ধের ১১ নং প্যারার গোটাটাই আমরা তুলে দিচ্ছি।

§ ১১. “সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার উপযোগী শ্রেণীশক্তি কারা? কিভাবে তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে? আমরা পরিষ্কার বলে এসেছি সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিশেষত মার্কিন-ভারত অক্ষশক্তি ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের বিরোধিতার প্রশ্নটিই হচ্ছে এই শ্রেণীশক্তি চিহ্নিত করার প্রধান মানদন্ড। শাসক শ্রেণীর ‘জাতীয়তাবাদী’, ‘গণতন্ত্রী’ ইত্যাদি কিংবা ইসলাম নামধারী শক্তিসমূহ যে গোপনে প্রকাশ্যে এই শক্তির তাঁবেদার সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। শ্রমিক-কৃষক ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে দেশের গ্রাম শহরের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি শ্রেণী, মধ্যবিত্ত ও উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা গোষ্ঠীই হচ্ছে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাময় শক্তি। সত্যিকারভাবে এই শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তিই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বাংলাদেশে দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর স্বার্থ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অনুকূল ‘উন্নয়ন’ নীতির কারণে নানাভাবে সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্থ হলেও তাদের অধিকাংশই এখনো পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও তার তাবেদারদের সাথে আপোস করেই নিজেদের অবস্থান বজায় রেখে চলেছে। এর বড় কারণ একদিকে গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য নিজেদের সক্রিয়তার অভাব অন্যদিকে গণতান্ত্রিক শক্তি গড়ে ওঠার সম্ভাবনার প্রতি আস্থাহীনতা। আমার দৃঢ়ভাবে মনে করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেদিকে যাচ্ছে তাতে উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী যদি তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চান এবং দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্র অর্থাৎ জাতীয় অর্থনীতির বিকাশে আগ্রহী হন তাহলে গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশের লক্ষ্যে তাদের যথাসাধ্য সক্রিয় হতে হবে।”

এই প্যারায় ৫ বাম দলের ভাষায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার উপযোগী শ্রেণীশক্তি চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রথমেই বলা দরকার যে, ৫ বাম দল যাদের আদর করে দেশীয় উদ্যোক্তা বলছে তাদের শ্রেণীগতভাবে চিহ্নিত করার বহুল ব্যবহৃত ও সহজ মার্কসবাদী পরিভাষাটি হলো দেশীয় পুঁজিপতি। এই দেশীয় পুঁজিপতি কারা? শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, নির্মাণ, পরিবহণ, হোটেল-রেস্তোরা, ব্যাংক-বীমা, পণ্য বিতরন ও খুচরা বিক্রিয়, মিডিয়া সহ সকল ক্ষেত্রের দেশীয় পুঁজির মালিক পুঁজিপতিগণ। এই পুঁজিপতিদের তারা যা সেই নামে না ডেকে উদ্যোক্তা নামের আড়ালে তাদের শ্রেণীগত অবস্থানকে আড়াল করবার চেষ্টা করেছে ৫ বাম দল। দেশীয় পুঁজিপতিদের তারা হাজির করেছে শ্রমিক শ্রেণীর ঘনিষ্ট মিত্র হিসেবে। পুরো প্যারা জুড়েই জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করবার বদমতলব দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

৫ বাম দল প্রথমে শুধু উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশীয় পুঁজিপতি, অর্থাৎ পুঁজিমালিকদের সেই অংশ যারা সরাসরি শ্রমশক্তি শোষণ করে, তাদেরকে মিত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। একটু পরেই অবশ্য শুধু উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তার পরিবর্তে সমগ্র দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠীকেই মিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এভাবে সমগ্র দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণীকে, কার্যতঃ বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীকে, ৫ বাম দল তাদের মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। শুধু মাত্র শাসক শ্রেণীর একটি অংশ, যাদেরকে ৫ বাম দল বলছে ‘শাসকশ্রেণীর ভরকেন্দ্রে অবস্থানকারী গোষ্ঠী’, তাদেরকেই শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। § ১-এ কর্মসূচি প্রণেতারা বলছেন “শাসকশ্রেণীর ভরকেন্দ্রে যে গোষ্ঠীটি অবস্থান করছে, এদের পরিগঠন ও পরিপুষ্টি প্রায় সর্বাংশেই সম্পন্ন হয়েছে অভ্যন্তরীণ লুণ্ঠন এবং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী শক্তি বিশেষভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় শাসক-শোষকগোষ্ঠীর সেবাদাসত্বের মধ্যে।” সুতরাং দেশীয় শাসক শ্রেণী বা দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণী নয়, শাসকশ্রেণীর ভরকেন্দ্রে অবস্থানকারী গোষ্ঠীটিই হলো শত্র“। এদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ভরকেন্দ্রের বাইরে অবস্থানকারী দেশীয় পুঁজিপতিরা তাই ৫ বাম দলের মিত্র।

একইভাবে § ১০-এ আওয়ামী লীগের ‘চালিকা গোষ্ঠীটিকে’ চিহ্নিত করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার হিসেবে। ৫ বাম দলের বিশ্লেষণী কাঠামো অনুসারে আওয়ামী লীগের এই ‘চালিকা গোষ্ঠীটির’ কর্তৃত্ব খর্ব (কর্তৃত্ব খর্বের কথা বলতেই ৫ বাম দল স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে) করতে পারলে এটিও ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার উপযোগী’ সংগঠনে পরিণত হবে।

এভাবে শত্র“-মিত্র চিহ্নিত করার পর বাকি থাকে এমন এক কর্মসূচি নির্ধারন যা ‘শাসকশ্রেণীর ভরকেন্দ্রে অবস্থানকারী গোষ্ঠীটির’ ‘সকল ক্ষমতা অপসারণ’ করবে। যে কর্মসূচি বাংলাদেশে লুণ্ঠনের নৈরাজ্যের বদলে স্থাপন করবে পুঁজিবাদী শোষণের শৃঙ্খলা, কায়েম করবে ‘দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর’ শাসন। যে কর্মসূচি বাংলাদেশে বিরাজমান লুণ্ঠন, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের হাত থেকে বুর্জোয়া সম্পত্তি সম্পর্ক ও পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক রক্ষা করবে। এদেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে রক্ষার এমন কর্মসূচি পুঁজিবাদী সংস্কারের কর্মসূচি ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে? ঠিক তেমন এক কর্মসূচিই হাজির করেছে ৫ বাম দল। ৫ বাম দলের পতাকায় তাই জ্বলজ্বল করছে ‘বিপ্লব নয়, সংস্কার’।

৫ বাম দলের বুর্জোয়া শ্রেণীর তাবেদারির এই হলো চেহারা।

বুর্জোয়াদের তাবেদারি করতে গিয়ে শ্রমিক, কৃষক আর পুঁজিপতিকে একক শ্রেণী হিসেবে চিহ্নিত করে ৫ বাম দল বলছে: “শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি শ্রেণী, মধ্যবিত্ত ও উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা গোষ্ঠী ……. এই শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তিই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” এই শ্রেণী সমূহের নয়, বলা হচ্ছে এই শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তির কথা।

শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও দেশীয় পুঁজিপতি প্রত্যেকেরই স্বতন্ত্র শ্রেণী স্বার্থ রয়েছে। শ্রমিক শ্রেণী ও দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণী উভয়ের শ্রেণী স্বার্থ পরস্পরবিরোধী, যার ফয়সালা হতে পারে দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণীর উচ্ছেদে, যে ফয়সালাটা করতে হবে খোদ শ্রমিক শ্রেণীকেই। এই ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি শ্রমিক শ্রেণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সেই চূড়ান্ত ফয়সালার দিকে নজর রেখে কর্মসূচি নির্ধারণ করা যেখানে বিপ্লবীদের কর্তব্য সেখানে বিপ্লবী হিসেবে ভান করা ৫ বাম দল শ্রমিক ও পুঁজিপতির মধ্যেকার সব বিরোধ এড়িয়ে গিয়ে তাদের মাঝে ঐক্য স্থাপন করতে চাইছে। কথার বহু মারপ্যাঁচ সত্ত্বেও এটাই হলো তাদের রণনৈতিক লাইন। বটেই তো, মার্কস-এঙ্গেলস্ই তো বলেছেন, “বুর্জোয়াদের মনে যাতে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা না থাকে, সেজন্য তাদের কাছে স্পষ্টভাবে এবং সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে, লাল জুজু সত্যই জুজু মাত্র, তার কোন অস্তিত্বই নেই। ……. উঠিয়ে দাও শ্রেণী-সংগ্রাম, তাহলে বুর্জোয়া ও ‘সমস্ত স্বাধীন লোক’ ‘প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে যেতে আর ভয় পাবে না’।” (বেবেল, লিবক্লেখত, ব্রাকে প্রমুখের কাছে মার্কস ও এঙ্গেলসের পত্র, ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৯)

এভাবে শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও দেশীয় পুঁজিপতি সকলকেই একটি একক শ্রেণী হিসেবে উপস্থিত করবার পর পরই ৫ বাম দলের পক্ষ থেকে হাজির করা হয়েছে তাদের সকলের অভিন্ন শ্রেণী স্বার্থ ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ’। ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের’ ধ্বনি তুলে তারা দেশীয় পুঁজিপতিদের সহায়তা চাইছে। এজন্য দেশীয় পুঁজিপতিদের ‘যথাসাধ্য সক্রিয়’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্যারার অর্ধেক (ঠিক অর্ধেক, ১০ লাইন) ‘দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠির’ প্রশ্নে নিবেদিত।

বর্তমান বাংলাদেশে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের ধ্বনি তুলতে পারে সাধারণভাবে ক্ষুদে বুর্জোয়া বা পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী, বিশেষ করে পেটি বুর্জোয়াদের সেই অংশটি যাদের মধ্যে বড়পুঁজির মালিক হবার আকাংখা রয়েছে, যারা একই সাথে লক্ষ্য করছে সাম্রাজ্যবাদের সাথে সম্পর্ক না থাকলে বড় পুঁজির মালিক হওয়া সম্ভব নয় এবং তেমন সম্পর্ক স্থাপনের মত জায়গা তাদের জন্য আর নেই, কেননা সেই ধরনের সম্পর্ক ১৯৭১ সালের পরই বাংলাদেশের বর্তমান শাসক শ্রেণী স্থাপন করেছে। এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই পেটি বুর্জোয়াদের একাংশ, বাম পেটি বুর্জোয়ারা, এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। তাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান উপরে উল্লিখিত বঞ্চণার দরুন। বর্তমানে এরা চায় সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব মুক্ত পুঁজিবাদ। কিন্তু সুুযোগ পাওয়া মাত্র এদের একাংশ, বিশেষ করে নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদের সাথে রফা করতে প্রস্তুত।

৫ বাম দলের কর্মসূচিতে বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী সাহায্য সংস্থা বা এনজিও-র তৎপরতা নিষিদ্ধ করা বা তাদের পুঁজি ও সম্পত্তি জাতীয়করণের কোন কথাই যে বলা হয় নি তা খামোকা নয়। এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী এই মহলটির জন্য নিজেদের রাজনীতির দরজা খুলে রেখেছে তারা।

৩.

৫ বাম দলের বিবেচনায় দেশীয় পুঁজিপতিরা ‘সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্থ’। তারা ‘সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, তাবেদারদের সাথে আপোস করেছে’। আপোসের কারণ ‘গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য তাদের সক্রিয়তার অভাব’, এরা ‘গণতান্ত্রিক শক্তি গড়ে ওঠার সম্ভাবনার প্রতি আস্থাহীন’। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে দেশীয় পুঁজিপতিরা ‘সক্রিয়’ নয়, ‘আস্থাহীনতায়’ ভুগছে। দুই-ই বিষয়ীগত (subjective) সমস্যা- বুঝের অভাব, সাহসের অভাব, নেতৃত্বের অভাব, উপযুক্ত নীতির অভাব।

দেশীয় পুঁজিপতিরা কেন সাম্রাজ্যবাদের সাথে হাত মিলায়, তার অধীনতা মেনে নেয় এই-ই হলো তার ৫ বাম দলীয় ব্যাখ্যা। তাদের কাছে দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণীর কোন অতীত নেই, এদের বিকাশের কোন ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা নেই, উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদের সাথে এদের গড়ে ওঠার কোন সম্পর্ক নেই। যেহেতু এরা ‘সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্থ’’ সেহেতু তারা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার হাত থেকে মুক্তি চায়। ৫ বাম দলের গোপন আশা উপযুক্ত কর্মসূচি পেলেই দেশীয় বুর্জোয়ারা তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়াবে। সেই আশাতেই তাদের এই কর্মসূচি।

৫ বাম দলের বক্তব্য হলো, যদি “বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেদিকে যাচ্ছে তাতে উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী যদি তাদের নিজেদের স্বার্থরক্ষা করতে চান” তাহলে তাদের কর্তব্য হচ্ছে “গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশের লক্ষ্যে সক্রিয় হওয়া।” সোজা কথায় নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থরক্ষায় দেশীয় বুর্জোয়াদের উচিৎ ৫ বাম দলকে সমর্থন করা, ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের’ কর্মসূচি গ্রহণ করা। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে? কোন ভবিষ্যতের হাত থেকে দেশীয় পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে? তারা কি বিপ্লবের হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে চায়? নাকি বিপ্লবের মাঝেই নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়?

বিপ্লবের বিজয় নয়তো প্রতিবিপ্লবের জয়- এই হলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রশ্নটি কেবল এভাবেই উত্থাপন করা চলে। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে একটি সফল বিপ্লব বাংলাদেশে সকল সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি ও দেশীয় সকল বৃহৎ পুঁজি বাজেয়াপ্ত করবে, মাঝারি ও ছোট পুঁজির ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে সীমিত করবে, শ্রেণী সংগ্রামকে অবাধে বিকশিত করবার সুযোগ সৃষ্টি করবে, রাষ্ট্র ও সমাজে শ্রমিক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণ হবে ক্রমবর্ধমান- সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যা শেষ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের রূপ নেবে। কোন সন্দেহ নেই যে দেশীয় পুঁজিপতিরা এমন ভবিষ্যৎ চায় না।

সুতরাং দেশীয় পুঁজিপতিদের ‘নিজেদের স্বার্থটা’ শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবে রক্ষিত হবে না। তাদের স্বার্থটা হলো বড় জোর স্বাধীন জাতীয় পুঁজি হিসেবে শোষণ চালানো, পুঁজির আনুপাতিক হারে মোট জাতীয় উদ্বৃত্ত মূল্যের অংশীদার হওয়া, সেখানে যাতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সাথে প্রতিযোগিতায় পড়তে না হয় তা নিশ্চিত করা। এ জন্য তাদের সর্বোচ্চ কর্মসূচি হতে পারে বাজার সংরক্ষণের কর্মসূচি, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সামাজিক বিপ্লব নয়। সে জন্যই ৫ বাম দল বিপ্লবের পরিবর্তে হাজির করেছে ‘জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের’ কর্মসূচি।

৫ বাম দলের ‘জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের’ কর্মসূচি মূলতঃ অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদেরই কর্মসূচি, যার সারবস্তু হলো দেশীয় পুঁজিপতিদের জন্য আভ্যন্তরীণ বাজার সংরক্ষণ, এর বেশী কিছু নয়। কিন্তু দেশীয় পুঁজিপতিরা শুধু নিজ দেশের বাজারের জন্য উৎপাদনকে সীমিত রাখবে এমনটি ভাবা নিতান্তই মূর্খতা, ক্রমবর্ধমান পুনরুৎপাদন ও মুনাফার জন্য বৈদেশিক বাজারে তাদের প্রবেশ করতেই হবে। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার সাথে বাহ্যিকভাবে দূরত্ব বজায় রেখে তার হাত থেকে সাময়িকভাবে মুক্ত থাকা গেলেও শেষ পর্যন্ত ‘জাতীয় অর্থনীতিকে’ সেখানেই ফিরে যেতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে সাম্রাজ্যবাদের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সম্পর্কহীন থেকে কোন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই নিজেকে রক্ষা করতে, বেশী দূর অগ্রসর হতে ও বিকশিত হতে পারে না। ৫ বাম দল ঘোষিত ‘জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের’ কর্মসূচি সেই দিক থেকে ঐতিহাসিকভাবে পশ্চাদমুখী।

তবে ৫ বাম দলের এই কর্মসূচিটি মোটেই নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আরো আগেই এমন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তারা শুধু একে বলছে ‘স্বাধীন জাতীয় বিকাশের’ কর্মসূচি। ২০০৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সিপিবি-র অষ্টম কংগ্রেসে ঘোষণা করা হয়েছে: “বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীন জাতীয় বিকাশের প্রধান শত্র“ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।” ৫ বাম দল শুধু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বদলে বলছে মার্কিন-ভারত অক্ষ শক্তির কথা, এভাবে তারা সিপিবি ঘোষিত কর্মসূচিটি নিজেদের কন্ঠে ধারণ করেছে।

কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণী এই কর্মসূচির জন্য কেন লড়াই করবেন? বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর প্রয়োজন ‘স্বাধীন জাতীয় বিকাশ’ বা ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ’ তথা দেশীয় পুঁজিপতিদের জন্য বাজার সংরক্ষণ নয়। মজুরী শোষণ উচ্ছেদের লড়াইয়ে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে উপযুক্ত অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার জন্যই বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক গণতন্ত্র, প্রয়োজন নিজেকে শাসক শ্রেণীতে উন্নীত করা। বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর জন্য রাজনৈতিক গণতন্ত্র মানে জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। বর্তমান বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করবে এই জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। এটাই বর্তমান পর্যায়ে বাংলাদেশ বিপ্লবের লক্ষ্য। এই বিপ্লব বাংলাদেশের কৃষকের হাতে তুলে দেবে জমি আর শ্রমিক শ্রেণীর জন্য নিশ্চিত করবে শ্রেণী সংগ্রামকে অবাধে বিকশিত করবার, স্পষ্টতর ও তীব্রতর করে তুলবার সর্ববিধ সুযোগ। শুধুমাত্র এই পথেই বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।

এটাই হলো মার্কসবাদের শিক্ষা।

‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ’-এর কর্মসূচি গ্রহণের অর্থ শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের হাতে সমর্পণ করা। এর অর্থ বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীকে উচ্ছেদের বিপ্লবী লক্ষ্যকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা, বা যা একই কথা, বাতিল করে দেয়া। ৫ বাম দলের ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের’ এই কর্মসূচিটি হলো শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ বিরোধী, চূড়ান্তভাবে প্রতিক্রিয়াশীল এক ঘৃণ্য কর্মসূচি।

৪.

§ ১২-তে ‘জাতীয় অর্থনীতির’ পক্ষে রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের সূত্র হাজির করা হয়েছে: “শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি শ্রেণী, মধ্যবিত্ত ও দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্র ও দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর স্বার্থ ভিত্তিক ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্যেই এই শক্তির বিকাশের মূল সূত্র নিহিত।”

এখানে শ্রেণী সমূহের সাথে ‘দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্র’-কে এক করে গুবলেট পাকানো হয়েছে- শ্রেণী প্রশ্নকে জোলো করবার, পাতলা করবার দিকে বরাবর ৫ বাম দলের ঝোঁক। তবে আমাদের সমালোচনার জায়গা সেটি নয়। এখানে পরস্পর বিরোধী শ্রেণী সমূহের অভিন্ন স্বার্থ ভিত্তিক সংগ্রামের যে লাইন নির্ধারণ করা হয়েছেতাতে শ্রমিক শ্রেণীকে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম স্থগিত করতে হয়। আশা করা যায় দেশীয় পুঁজিপতিরা এর বিনিময়ে শ্রমিকদের মনুষ্যোচিত জীবন যাপনের উপযুক্ত মজুরী দেবে! জাতির বৃহত্তর স্বার্থে, জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে দেশীয় পুঁজিপতিদের এই সদিচ্ছা জাগ্রত হবে! শ্রমিকদের এ জন্য কোন সংগ্রামের প্রয়োজন হবে না!!

আবারো, যে একক স্বার্থ ভিত্তিক ধারাবাহিক সংগ্রামের কথা বলা হচ্ছে, সেটি কী? তা হলো ‘দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্রকে’ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে রক্ষা করা। সোজা কথায়, শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী শ্রেণী সমূহের কর্তব্য হচ্ছে দেশীয় পুঁজিপতিদের রক্ষা করা, বাঁচিয়ে রাখা যাতে সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা তাদের শোষণের ক্ষেত্রটা ‘সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্থ’’ না হয়। বাংলাদেশের শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী শ্রেণী সমূহের জন্য এই কর্তব্যই নির্ধারণ করেছে ৫ বাম দল।

৫.

কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

৭ দফা কর্মসূচির প্রথম দফাতেই “সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ, দেশীয় উদ্যোক্তা ও উৎপাদকগোষ্ঠীর স্বার্থোপযোগী সংবিধান প্রণয়ন” এর কর্মসূচি হাজির করেছে ৫ বাম দল। ৫ বাম দলের কাঙ্খিত সংবিধান শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি শ্রেণী সমূহ এবং দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণী সকলেরই স্বার্থ রক্ষা করবে। একই সংবিধান পরস্পর বিরোধী শ্রেণী সমূহের স্বার্থ কী করে সমভাবে প্রতিফলিত করতে পারে? কিভাবে শ্রমিক শ্রেণী ও দেশীয় পুঁজিপতি উভয়েরই স্বার্থ একই সংবিধানের অধীনে সমভাবে রক্ষা পেতে পারে?

বৈষয়িকভাবে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণের ভোগের বৃদ্ধিতে। অপর দিকে দেশীয় পুঁজিপতিদের স্বার্থ মুনাফার নিশ্চয়তায়। মুনাফার জন্য উৎপাদন এই হলো দেশীয় পুঁজিপতিদের লক্ষ্য। শ্রমজীবী জনগণের ভোগের বৃদ্ধি তার কাছে ততটুকুই প্রাসঙ্গিক যতটুকু মুনাফা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। শ্রমজীবী জনগণের ভোগের মাত্রা কোনক্রমেই সেই সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে না যাতে করে পুঁজিপতির ‘যুক্তিসঙ্গত’ মুনাফায় টান পড়ে।

সংবিধানে দেশীয় পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা মানে সাংবিধানিকভাবে তার শোষণের স্বার্থ, শোষণের অধিকার রক্ষা করা। সাংবিধানিকভাবে পুঁজিপতির মুনাফার অধিকার রক্ষা করা। দেশীয় পুঁজিপতিদের এই স্বার্থ রক্ষা করতে হলে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী সংগ্রামকে ছেঁটে ফেলতে হবে, বাতিল করতে হবে শ্রেণী সংগ্রামকে। সুতরাং নতুন সংবিধান হবে আবশ্যিকভাবে একটি বুর্জোয়া সংবিধান, সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার বাণী সেখানে থাকবে ঠিকই, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীকে তা ঠেলে ঢোকাবে বুর্জোয়া পার্লামেন্টের খোঁয়াড়ে।

বাম পেটি বুর্জোয়ারা সমাজতন্ত্রকে নিছক উৎপাদনের ন্যায় সঙ্গত বন্টনের একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখে। মুনাফার অধিকার সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদানের মাধ্যমে সেখান থেকেও পিছু হটেছে ৫ বাম দল।

নতুন সংবিধানের কথা ৫ বাম দল বলছে বটে, কিন্তু ফের সেই পুরনো সংবিধানেই তারা ফিরে গিয়েছে। পায়ের পাতা তাদের পেছন দিকে ঘুরানো। যতই তারা সামনে এগুতে চায় ততই তারা পশ্চাদগামী।

৬.রাষ্ট্র ও একনায়কত্বের প্রশ্নে মার্কসবাদের বিকৃতি

৫ বাম দল ভুক্ত দলগুলির নেতৃত্ব সাধারণভাবে নিজেদের মার্কসবাদী হিসেবে দাবি করে থাকেন। কিন্তু তাঁদের কর্মসূচিটিতে তাঁরা চোখ বুঁজে মার্কসবাদের বিকৃতি ঘটিয়েছেন।

§ ১২ থেকে: “বিদ্যমান রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইন এবং লুটেরা মাফিয়া গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব খর্ব না করে কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরী হতে পারে না।”

– ঘুরিয়ে বললে, বিদ্যমান রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব খর্ব করে, বিদ্যমান রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে নয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্ভব। মার্কসবাদকে এখানে দুই দিক থেকে বিকৃত করা হয়েছে।

প্রথমতঃ বিদ্যমান রাষ্ট্র হলো বুর্জোয়া শ্রেণীর একনায়কত্ব। বিদ্যমান গণতন্ত্র হলো বুর্জোয়া শ্রেণী দ্বারা বুর্জোয়া শ্রেণীর জন্য গণতন্ত্র। বল প্রয়োগের ওপরই এই একনায়কত্ব, এই গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে। বুর্জোয়াদের এই একনায়কত্বকে ৫ বাম দল নিছক শাসন কর্তৃত্বের একটি অবস্থা হিসেবে দেখছে। একনায়কত্বের অর্থ যে বল প্রয়োগ তা আর থাকছে না। মার্কসবাদের এই বিকৃতির ফলে শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের সমস্যা দাঁড়ায় নিছক ‘গণতন্ত্রের’ অধীনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সমস্যা।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ঠিক এই বিকৃতিই করেছিলেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতা, জার্মান পার্টির নেতা কার্ল কাউৎস্কী। কাউৎস্কীর সমালোচনা করতে গিয়ে লেনিন তাঁর সর্বহারা বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউৎস্কী গ্রন্থে লিখেছেন, “একনায়কত্বকে ‘শাসন-কর্তৃত্বের অবস্থা’ (খোদ পরবর্তী ২১ পৃষ্ঠাতে তিনি এই আক্ষরিক অর্থেই তা ব্যবহার করেছেন) বলে ব্যাখ্যা করা কাউৎস্কী প্রয়োজন মনে করেছেন, কারণ তাহলে বৈপ্লবিক বলপ্রয়োগ, বলপ্রয়োগ ভিত্তিক বিপ্লব অদৃশ্য হয়ে যায়। ‘শাসন-কর্তৃত্বের অবস্থা’ হল এমন একটা অবস্থা যেখানে যেকোনো সংখ্যাগরিষ্ঠই নিজেকে দেখতে পায়… ‘গণতন্ত্রেরই’ অধীনে। এ প্রতারণার বদৌলতে বিপ্লব স্বচ্ছন্দেই অদৃশ্য হয়ে যায়।”

লেনিন স্পষ্টভাবেই বলছেন যে, বুর্জোয়া একনায়কত্বের পরিবর্তে বুর্জোয়া কর্তৃত্বের অবস্থা দেখতে পাওয়ার অর্থই হলো নিজেদের ‘গণতন্ত্রের’ অধীনে দেখতে পাওয়া। ৫ বাম দল ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশের অবস্থা দেখে, যে জন্য তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যই হলো ‘সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বাস্তব পরিস্থিতি ও পরিবেশ তৈরী’ করা। তাদের কাছে বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষকের সমস্যা হলো একটি ‘সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের’ সমস্যা। রাজনৈতিক মর্মবস্তুর দিক থেকে ৫ বাম দলের কর্মসূচি তাই হলো নির্বাচনী সংস্কারের কর্মসূচি।

দ্বিতীয়তঃ কাউৎস্কী যেখানে একনায়কত্বের সংজ্ঞা দিতে যেয়ে মার্কসবাদের উপরে উল্লিখিত বিকৃতি ঘটিয়েছেন সেখানে ৫ বাম দল একনায়কত্বের প্রশ্নকে একবারেই তুলে দিয়েছে। এবং এখানেই তারা দ্বিতীয় দফা মার্কসবাদের বিকৃতি ঘটিয়েছে।

বুর্জোয়া একনায়কত্ব যদি হয় নিছক বুর্জোয়া কর্তৃত্বের অবস্থা, তাহলে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বও দাঁড়ায় নিছক শ্রমিক শ্রেণীর কর্তৃত্বের অবস্থা। এভাবে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বকে পুরোপুরি বাতিল করে দেয়া হয়েছে।

তত্ত্বগতভাবে ও কার্যক্ষেত্রে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বের প্রশ্নকে এভাবে বাতিল করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রুশ্চেভ চক্র ও চীনে দেঙ চক্র। সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব মানে শ্রমিক শ্রেণীর কর্তৃত্বের অবস্থা এই তত্ত্ব থেকে যে সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে তা হলো বুর্জোয়া সম্পত্তি সম্পর্ক ও পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একটি দেশ সমাজতান্ত্রিক হতে পারে, এবং শ্রমিক শ্রেণী নিছক সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। ক্রুশ্চেভ চক্রের অনুসারী মণি সিং-মোহাম্মদ ফরহাদের এর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করতো। এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, ৫ বাম দলের শরীক জাতীয় গণফ্রন্ট আজকের চীনকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে দেঙ চক্রের অনুসারী হয়েছে। সকলেই তারা সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বকে বাতিল করে দিয়েছে।

মার্কসবাদের ঠিক এই বিকৃতিকারীদের, এই দলদ্রোহীদের সমালোচনা গিয়ে লেনিন বলেছেন:

“সর্বহারা শ্রেণীর বৈপ্লবিক একনায়কত্ব হলো এমন একটা শাসন যা বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণী কর্তৃক বলপ্রয়োগের দ্বারাই অর্জিত এবং রক্ষিত, এমন শাসন যা আইনের বাধা-বন্ধন মুক্ত।

“এই যে-সত্যটি প্রতিটি শ্রেণী-সচেতন শ্রমিকের (যারা জনগণেরই প্রতিনিধিত্ব করে, এবং যারা সেই উচ্চতর স্তরের পেটি-বুর্জোয়া বদমায়েসদের প্রতিনিধি নয় যাদের পুঁজিপতিরা কিনে নিয়েছে উৎকোচ দিয়ে, যেরূপ হল সকল দেশেরই সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদীরা) কাছে দিনের আলোর মতই স্পষ্ট, এই যে-সত্যটি নিজেদের মুক্তির জন্যে সংগ্রামরত শোষিত শ্রেণীসমূহের প্রতিটি প্রতিনিধির কাছে স্বতঃস্পষ্ট, এই যে-সত্যটি হল প্রত্যেক মার্কসবাদীর কাছেই বিতর্কের উর্ধ্বে, সেই সহজ-সরল সত্যটিই কিন্তু ‘জোর করে বের করে নিতে’ হবে মহাপন্ডিত কাউৎস্কীর কাছ থেকে! এর অর্থ কী দাঁড়ায়? দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতারা যে দাসসুলভ মনোবৃত্তি নিয়ে বুর্জোয়াদের পদসেবার ঘৃণ্য মোসাহেব হয়ে দাঁড়িয়েছেন, সেই দাস-মনোবৃত্তিই হল এর অর্থ।” (লেনিন, সর্বহারা বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউৎস্কী)

লেনিনের চেয়ে স্পষ্ট আর কে চিনেছেন এই সব দলদ্রোহীদের?

৭.পার্লামেন্টবাদ; আমলাতন্ত্র উচ্ছেদের পরিবর্তে সংস্কারের কর্মসূচি

১ নং কর্মসূচির খ উপধারা: “সর্বাধিক নিম্নতম খরচের সরকার প্রতিষ্ঠা। ……. বিদ্যমান ঔপনিবেশিক গণবিরোধী প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্রিক কাঠামো ও কর্তৃত্বের আমূল পূনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।”

প্রতিটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবেই সর্বাধিক নিম্নতম খরচের সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিটি ওঠে। ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের অভিজ্ঞতার সারসংকলন করে ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ গ্রন্থে মার্কস লিখেছেন, “ফৌজ ও আমলাতন্ত্র, মোটা খরচের এই দুই খাত দূর করে কমিউন সমস্ত বুর্জোয়া বিপ্লবের সুলভ প্রশাসন ধ্বনিটিকে সত্য করে তোলে।”

কিন্তু কর্মসূচি হিসাবে সর্বাধিক নিম্নতম খরচের সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে আমলাতন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে নতুন প্রশাসন যন্ত্র দিয়ে তার প্রতিস্থাপনের যে কর্মসূচি গ্রহণ বাধ্যতামূলক তা পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছে ৫ বাম দল।

‘সর্বাধিক নিম্নতম খরচের সরকার প্রতিষ্ঠার’ প্রতিশ্র“তি দেয়ার পর তারা ঘোষণা করেছে ‘আমলাতন্ত্রিক কাঠামো ও কর্তৃত্বের আমূল পূনর্গঠন’ এর কর্মসূচি¬। অর্থাৎ আমলাতন্ত্র থাকবে, শুধু তার পুনর্গঠন করা হবে। আমলাতন্ত্রবিহীন রাষ্ট্রের কথা ৫ বাম দল চিন্তাও করতে পারে না। নিজেদের এই কর্মসূচিকে গভীরতা ও গাম্ভীর্য্য দানের জন্য ‘আমূল’ কথাটি জুড়ে দিয়ে তারা বলছে আমলাতন্ত্রের ‘আমূল পূনর্গঠন’ করা হবে; তাহলেও সেটা পুনর্গঠনই অর্থাৎ সংস্কার মাত্র। আমলাতন্ত্রকে তারা স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে ধরে নিয়েছে। আর তাই বিপ্লবের পর আমলাতন্ত্র সংস্কারের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, আমলাতন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করবার যে কোন কর্মসূচি থেকে সযত্নে বিরত থেকেছে।

কোনো রকম প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়াই রাষ্ট্র পরিচালনার ‘স্বপ্ন’ আমরা দেখি না। কিন্তু পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটা ছাড়াই নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব এবং সেটাই হলো প্রকৃত বিপ্লবী পথ। লেনিন তাঁর রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “আমলাতন্ত্রকে তৎক্ষণাৎ, সর্বত্র ও সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করার কথাই উঠতে পারে না। এটা ইউটোপিয়া। কিন্তু পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে চূর্ণ করা ও তৎক্ষণাৎ এমন একটা যন্ত্র নির্মাণ শুরু করা যাতে ক্রমশ সমস্ত আমলাতন্ত্রকেই শূন্যে পরিণত করা সম্ভব হবে- এটা ইউটোপিয়া নয়, এটা কমিউনের অভিজ্ঞতা, এটা হলো বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের প্রত্যক্ষ ও উপস্থিত কর্তব্য।”

লেনিন আরো লিখেছেন, “রাজনৈতিক ক্ষমতা জয় করে শ্রমিকেরা পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে ভাঙবে, তার ভিত্তি চূর্ণ বিচূর্ণ করবে, তার একটি ইঁটও অবশিষ্ট রাখবে না, তার জায়গায় ওই একই শ্রমিক ও কর্মচারী দিয়ে নতুন যন্ত্র বসাবে, কেউ যাতে ফের আমলাতন্ত্রীতে পরিণত না হয় তার জন্য তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেবে, মার্কস ও এঙ্গেলস তা সবিস্তারে নির্দেশ করে গেছেন: ১) শুধু নির্বাচন নয়, যে-কোনো সময়ে প্রত্যাহার; ২) মজুরদের চেয়ে বেশি বেতন নয়; ৩) অবিলম্বে এমন অবস্থায় যাওয়া যেখানে নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের কাজ চালাচ্ছে সবাই, যেখানে সাময়িকভাবে সবাই হয়ে উঠছে ‘আমলা’, ফলে কেউ আর ‘আমলা’ হয়ে থাকতে পারছে না।” (রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

পুনর্গঠন বা সংস্কার নয়, পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে চূর্ণ করা, আমলাতন্ত্রের ভিত্তি চূর্ণ বিচূর্ণ করা, তার একটি ইঁটকেও অবশিষ্ট না রাখা- এই হলো বিপ্লবের কাজ। চূর্ণ বিচূর্ণ আমলাতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করবে নতুন প্রশাসনিক যন্ত্র, আর নতুন এই যন্ত্র নির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে তৎক্ষণাৎ। এই শিক্ষাই লেনিন দিয়েছেন।

উৎপাদন ব্যবস্থাসহ সমগ্র শাসন ব্যবস্থাকে সংগঠিত ও পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে শ্রমিক-কৃষকের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বুর্জোয়া প্রশাসন ব্যবস্থা ও আমলাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয়- প্রতিটি পর্যায়ে প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচন করা; গ্রামীণ জনগণের ভোটে গ্রাম পরিষদ গঠন; জাতীয়করণকৃত শিল্প-কারখানা ও রাষ্ট্রীয় খামার পরিচালনার জন্য শ্রমিকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ব্যবস্থাপনা পরিষদ গঠন; সকল পর্যায়েই নির্বাচিত ব্যক্তিকে প্রত্যাহারের (recall)) ব্যবস্থা; প্রতিটি ক্ষেত্রেই মজুরের সমান বেতন কার্যকর করা এই-ই হলো আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে জনগণের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রবর্তনের পথ, এই-ই হলো মার্কসবাদ-লেনিনবাদের শিক্ষা। ৫ বাম দল এই মার্কসবাদী শিক্ষার সহস্র হাত তফাতে থেকে বুর্জোয়া পার্লামেন্টবাদী রাজনীতির ধারক হয়েছে।

বুর্জোয়া পার্লামেন্টবাদের অনুসারী কাউৎস্কীর সমালোচনা করে লেনিন লিখেছেন: “গণতন্ত্রের (জনগণের জন্য নয়) সাথে আমলাতন্ত্রকে (জনগণের বিরুদ্ধে) মেলানো বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথার সঙ্গে প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের পার্থক্য কাউৎস্কী একেবারেই বোঝেন নি এ প্রলেতারীয় গণতন্ত্র আমলাতান্ত্রিকতার মূলোচ্ছেদের তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেবে, এবং শেষ পর্যন্ত, আমলাতান্ত্রিকতার পরিপূর্ণ বিলোপ, জনগণের জন্য গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ প্রবর্তন পর্যন্ত সেসব ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে সমর্থ থাকবে।” (রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

লেনিন লিখেছেন: “আমেরিকা থেকে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স থেকে ইংলন্ড, নরওয়ে ইত্যাদি যে-কোনো পার্লামেন্টী দেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন: সত্যিকারের ‘রাষ্ট্রীয়’ কাজ চলে পর্দার অন্তরালে এবং তা চালায় দপ্তর, চ্যান্সেলারি, জেনারেল স্টাফ। পার্লামেন্টগুলোয় কেবল বাক্যবিস্তার চলে ‘সাধারণ লোককে’ ধোঁকা দেবার বিশেষ উদ্দেশ্যে।” (রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সাথে আমলাতন্ত্রকে মেলায়। আমলাতন্ত্র স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে শাসন ব্যবস্থাকে পরিচালনা করে, আর বুর্জোয়া গণতন্ত্র আগামী কয়েক বছর শাসক শ্রেণীর কোন্ লোকটি পার্লামেন্টে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে ও তাদের দমন করবে তা স্থির করে। বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথার এই দিকটির দিকে তাকিয়েই মার্কস ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ গ্রন্থে লিখেছেন: “কমিউনকে হতে হত পার্লামেন্টী নয়, কাজের সমিতি, একই সঙ্গে আইনদাতা ও কার্যনির্বাহক…”।

বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথার উচ্ছেদ ও আমলাতন্ত্রকে চূর্ণ বিচূর্ণ করা তাই একই কর্তব্যের দুটি দিক। আমলাতন্ত্রকে চূর্ণ বিচূর্ণ করতে অস্বীকৃতি তাই বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথাকে উচ্ছেদেরই অস্বীকৃতি। আমলাতন্ত্রের যে কোন পুনর্গঠনের কর্মসূচি প্রকৃতপক্ষে বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথাকে মর্মবস্তুতে পুরনো, চেহারায় নতুন রূপে প্রতিষ্ঠারই কর্মসূচি।

আমলাতন্ত্রের প্রশ্নে ৫ বাম দলের কর্মসূচি স্পষ্টতই চালাকীতে ভরা বিপ্লব বিরোধী একটি কর্মসূচি। এ তাদের পার্লামেন্টবাদী রাজনীতিরই সম্পূরক ও সম্প্রসারিত অংশ।

৮.প্রতিক্রিয়াশীল কৃষি কর্মসূচি

গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণী ও স্তরের সাথে শ্রমিক শ্রেণীর সম্পর্ক নির্ধারক মূল নীতি সমূহের প্রতিফলন ঘটে বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচিতে। গ্রামীণ বুর্জোয়া, গ্রামীণ মজুর ও কৃষক- বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এই হলো তিনটি প্রধান শ্রেণী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিপ্লবের কৃষি কর্মসূচি মূলতঃ কৃষক সম্পর্কিত কর্মসূচি। অর্থাৎ কৃষি কর্মসূচি শ্রমিক শ্রেণীর সাথে কৃষক জনগণের সম্পর্ক নির্ধারক। বাংলাদেশ বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণীর ঘনিষ্টতম মিত্র হিসেবে কৃষকদের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়েই বাংলাদেশের মার্কসবাদীরা বিবেচনা করেন।

কৃষি কর্মসূচির কোন পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এখানে করা সম্ভব নয় এবং আমাদের তা উদ্দেশ্যও নয়। তবে ৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যেই আমরা প্রথমে বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচির কিছু নীতিগত দিক সংক্ষেপে আলোচনা করবো।

আজকের দিনে বুর্জোয়াদের মুখোমুখি যেসব শ্রেণী দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে শুধু শ্রমিক শ্রেণী হল প্রকৃত বিপ্লবী শ্রেণী। অন্য সকল শ্রেণীই বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চায়; এই ব্যবস্থার অধীনেই নিজ শ্রেণীর জন্য অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থান অর্জন করতে চায়। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণী কখনো যদি অপরাপর শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার কথা বলে তবে তা বলতে পারে কেবল নির্দিষ্ট শর্তাধীনেই। কৃষি কর্মসূচিতে কৃষকের স্বার্থ রক্ষার কথাও আমরা শুধু কিছু শর্তাধীনেই বলতে পারি এবং বলি। এই শর্তগুলো কী? প্রথমত, কৃষি কর্মসূচি গ্রামাঞ্চলে সব ধরনের সামন্ত সম্পর্কের পরিপূর্ণ উচ্ছেদ সাধন করবে। দ্বিতীয়ত, এই কর্মসূচি গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী সংগ্রামের অবাধ বিকাশ ঘটাবে। বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচিকে এই দুই শর্ত আবশ্যিকভাবে পূরণ করতে হবে, অর্থাৎ কৃষি কর্মসূচিকে সামন্ত সম্পর্কের অবসান ও শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশের যে রাজনৈতিক লক্ষ্য সেটি অর্জনে সহায়তা করতে হবে। তা না হলে তা হবে প্রতিক্রিয়াশীল অথবা অকেজো একটি কর্মসূচি।

বাংলাদেশ বিপ্লবের কৃষি কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার প্রশ্নটি আসবেই। অনুপস্থিত ভূমি মালিক হলেন সেই ধরনের কৃষি জমির মালিক যিনি নিজ জমিতে কৃষক হিসেবে বা মজুর নিয়োগ করে ফসল উৎপাদন করেন না বা করতে অক্ষম; যার জমি হয় পতিত পড়ে রয়েছে কিংবা যিনি জমি মালিকানার সূত্রে জমির প্রত্যক্ষ ব্যবহারকারীর কাছ থেকে খাজনা আদায় করেন; জমির পরিমাণ কম না বেশি তা এক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার অবসান আমাদের কৃষি বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে কৃষিতে খাজনাখোরী উচ্ছেদ হবে এবং কৃষি উৎপাদনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ জমি খোদ কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, জমির খাজনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, বরং এর মাধ্যমে জমির খাজনা রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত হবে; জমির খাজনা জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা সম্ভব হবে। সুতরাং অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার অবসান চাইলে জমি জাতীয়করণের কথা বলতেই হবে।

এর পরেই যে প্রশ্ন আসে তা হলো জাতীয়করণকৃত জমি কৃষকের হাতে কিভাবে তুলে দেয়া হবে?

কৃষকের হাতে জমি তুলে দেয়ার অর্থ এই নয় যে জমি কৃষকের ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা হবে; এর অর্থ কৃষি উৎপাদনের উপায় জমি সাধারণ মালিকানা হিসেবে কৃষকের কাছে হস্তান্তর করা।

এবারে দেখা যাক ৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচিতে কী আছে।

কর্মসূচি নং ৪ (খ): “কৃষিতে আমূল ভূমি সংস্কারের অংশ হিসেবে সকল অনুপস্থিত ও বৃহৎ ভূমি মালিকানা ও সামন্ত অবশেষের সম্পর্কের অবসান। খোদ কৃষক কিংবা উৎপাদকের হাতে কৃষি জমি হস্তান্তর। খাস জমি এবং অন্যায়ভাবে দখলিকৃত জমি ভূমিহীন ও কৃষিমজুরদের মধ্যে বিতরণ এবং সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদনী কার্যক্রমের যৌথায়ন।”

প্রথম বাক্যটি খুবই দুর্বল, গোলমেলে। একদিকে ‘অনুপস্থিত ও বৃহৎ’ ভূমি মালিকানার অবসানের কর্মসূচি অন্যদিকে ‘সামন্ত অবশেষের সম্পর্কের’ (এর অর্থ যে কী তা কর্মসূচি প্রণেতারাই জানেন!) অবসানের কর্মসূচি। লক্ষ্য ও কর্মসূচিকে এখানে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। কোন বিশেষ উৎপাদন সম্পর্কের অবসান হতে পারে রাজনৈতিক লক্ষ্য, সেটি কী করে কর্মসূচির অংশ হয়?

ভূমি সংস্কারের এই কর্মসূচিতে দুটি ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগে ‘অনুপস্থিত ও বৃহৎ ভূমি মালিকানা’ সম্পর্কে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে ‘খাস জমি ও অন্যায়ভাবে দখলিকৃত জমি’ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই বিভাজন সচেতনভাবেই করা হয়েছে, বিভাজনের উদ্দেশ্য কর্মসূচি থেকেই পরিস্কার। অনুপস্থিত ও বৃহৎ ভূমি মালিকানার অবসান ঘটিয়ে সেই জমি কৃষক ও উৎপাদকের হাতে হস্তান্তরের করা হবে, অপরদিকে খাস জমি ও অন্যায়ভাবে দখলিকৃত জমি ভূমিহীন ও কৃষিমজুরদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। উভয় ক্ষেত্রেই জমি ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হবে, তবে শুধু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অর্থাৎ ভূমিহীন ও কৃষিমজুরদের জমিতে সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদনের যৌথায়ন করা হবে। জমি জাতীয়করণের কোন কর্মসূচি ৫ বাম দলের নেই। জমি ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা হবে বলেই জাতীয়করণের কোন কথা বলা হয়নি।

অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা জানি যে কৃষক, বিশেষ করে ছোট কৃষক তার জমি রক্ষা করতে পারে না; এটা শুধু আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা নয়, প্রতিটি পুঁজিবাদী দেশের ক্ষেত্রেই এটা সাধারণভাবে সত্য। কিন্তু ৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচির লক্ষ্যই হলো জমিতে কৃষকের ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠা।

কিন্তু জমি ব্যক্তিমালিকানায় থাকার অর্থই হলো, জমি ক্রয়ে পুঁজির ব্যবহার। এ প্রসঙ্গে মার্কস তাঁর পুঁজি গ্রন্থের ৩য় খন্ডে (অধ্যায় ৪৭) লিখেছেন: “ছোট জোতের চাষাবাদ, যেখানে এর সাথে জমির স্বাধীন মালিকানা ব্যবস্থা এক হয়, তার থেকে উদ্ভূত একটি সুনির্দিষ্ট ক্ষতিকর দিক হলো, জমি ক্রয়ে কৃষকের পুঁজি বিনিয়োগ।” “জমি ক্রয়ে পুঁজি ব্যয় সেই পুঁজিটুকুকে কৃষি থেকে সরিয়ে নেয়।”

“কৃষি জমি ক্রয়ে মুদ্রা-পুঁজির ব্যয়, তাই, কৃষি পুঁজির বিনিয়োগ নয়। এ হলো ছোট কৃষকরা নিজ উৎপাদনক্ষেত্রে যে পুঁজি নিয়োজিত করতে পারে তা সম পরিমাণে (pro tanto) হ্রাস পাওয়া। এটি তাদের উৎপাদনের উপায় সমূহকে সম পরিমাণে হ্রাস করে এবং তদ্বারা পুনরুৎপাদনের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা সংকীর্ণ করে তোলে। ছোট কৃষককে তা মহাজনের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করে, কেননা এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত ঋণ কমক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। এটা কৃষির জন্য একটা বাধা, এমনকি যখন এমন ক্রয়ের ঘটনা ঘটছে বৃহৎ ভূ-সম্পত্তিতে। এটা প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে অসংগতিপূর্ণ, যে ব্যবস্থা জমির মালিক ঋণগ্রস্থ কিনা সেটা সামগ্রিকভাবে উপেক্ষা করে, তা সেই ভূ-সম্পত্তি সে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকুক বা ক্রয় করুক।”

মার্কস আরো লিখেছেন: “এখানে, ছোট জোতের চাষাবাদে, জমির দাম, যা জমিতে ব্যক্তিমালিকানার একটি রূপ ও ফলাফল, খোদ উৎপাদনের পথে বাধা হিসেবে দেখা দেয়। বৃহৎ জোতের কৃষিতে এবং পুঁজিবাদী কায়দায় পরিচালিত বৃহৎ ভূ-সম্পত্তিতে, মালিকানা একইভাবে বাধা হিসেবে কাজ করে, কেননা তা প্রজা-চাষীদের (tenant farmer) উৎপাদনশীল পুঁজি বিনিয়োগকে সীমিত করে, যা চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তাকে উপকৃত করে না, করে জমির মালিককে।”

সুতরাং ঘোষিত কৃষি কর্মসূচির মাধ্যমে খোদ কৃষকদের সাথেই প্রতারণা করছে ৫ বাম দল। এই কর্মসূচি যেমন ভূমি থেকে কৃষকের পুনরায় উচ্ছেদ হওয়া বন্ধ করবে না তেমনি অনুপস্থিত ভূমি মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বীজও এর মধ্যে নিহিত। এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশে কোন অবদান তো রাখবেই না উল্টো ক্ষুদে মালিক ও মালিকানার স্বপ্ন জিইয়ে রেখে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশে সর্বোচ্চ বাধা সৃষ্টি করবে।

৯.

৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচিতে বৃহৎ ভূমি মালিকানার অবসানের কথা বলা হয়েছে। এ থেকে আমরা ধরে নিতে পারি যে পুঁজিবাদী কায়দায় উৎপাদনশীল বৃহৎ ভূমি মালিকানারও অবসান ঘটানো হবে। যেখানে ৫ বাম দল শিল্প-, বাণিজ্য-, ফিন্যান্স পুঁজিকে সর্ববিধ সহায়তা প্রদানে নতুন সংবিধান প্রণয়নের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সেখানে বৃহৎ ভূমি মালিকানার অবসানের কর্মসূচি কেন?

অন্যায়ভাবে দখলিকৃত জমি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে তেমন জমি ভূমিহীন ও কৃষিমজুরদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। যে জমি অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে, সেটা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র যে-ই করে থাকুক, তা তো মূল মালিকের কাছে যাওয়ার কথা, যেহেতু তা পূর্বে অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছিল। এভাবে মূল মালিকের কাছে জমি ফিরে যাওয়ার পর যদি দেখা যায় যে তাতে অনুপস্থিত বা বৃহৎ ভূমি মালিকানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাহলে ৫ বাম দলের কর্মসূচি অনুসারেই তা কৃষক বা উৎপাদকের কাছে     হস্তান্তর করা হবে; এই জমি ভূমিহীন বা কৃষিমজুরদের কাছে আসবে না, যদি না জমির মূল মালিক নিজেই ভূমিহীন বা কৃষিমজুর হোন।

কৃষি কর্মসূচিতে “মূলধন ও কৃষি উপকরণ সরবরাহের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানী, এনজিও ও দাদন-মহাজনি আধিপত্যের অবসান” ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। শুধুই আধিপত্যের অবসান; সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানী, এনজিও- সকলেই তারা থাকবে, শুধু আধিপত্যশীল অবস্থানে নয়। আধিপত্যের অবসান বলতে আর কিছু হতে পারে না।

কৃষি কর্মসূচির শেষের দিকে বৃহৎ জলাশয়, হাটবাজার, ঘাট, চারণ ভূমি, বন, পাহাড় ও সড়কের ক্ষেত্রেই কেবল ব্যক্তিমালিকানা ও ইজারা প্রথার অবসান এবং জনগণের সাধারণ সম্পত্তিতে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে এর বিপুল অধিকাংশ বর্তমানেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে নেই, তা আছে রাষ্ট্রের হাতে, রাষ্ট্রই তা ইজারা দিচ্ছে এবং জনগণকে এসব ভোগ করতে বাধা সৃষ্টি করছে। কৃষি কর্মসূচিতে ‘জনগণের সাধারণ সম্পত্তিতে রূপান্তরের’ কথা থাকলো বটে তবে সব চাইতে নিরাপদ স্থানে, তাতে সম্পত্তি মালিক শ্রেণীর ভয়ের কিছু নেই।

১০.

৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচি কৃষককে কৃষক হিসেবেই বাঁচিয়ে রাখবেÑ সেই হিসেবে ঐতিহাসিকভাবেই এটি এক পশ্চাদমুখী কর্মসূচি। কিন্তু তাদের কৃষি কর্মসূচির সর্বাপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল দিক হলো জমি কৃষকের ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করে গ্রামাঞ্চলে নতুন করে ক্ষুদে মালিকানা সৃষ্টি করা, যেখানে উৎপাদন উপায়ের উপর উৎপাদকদের সাধারণ মালিকানা প্রতিষ্ঠাই হলো শ্রমিক শ্রেণীর লক্ষ্য।

ফ্রেডারিক এঙ্গেলস্ এ প্রসঙ্গে বলেছেন: “উৎপাদন উপায়ের উপর অধিকার মাত্র দুটি রূপে সম্ভব হয়, হয় ব্যক্তিগত অধিকাররূপে, সমস্ত উৎপাদকদের ক্ষেত্রে এই অধিকার কখনও কোথাও ছিল না এবং শিল্প প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও অসম্ভব হয়ে উঠছে; নতুবা সাধারণের অধিকাররূপে, পুঁজিবাদী সমাজের নিজস্ব বিকাশের মধ্য দিয়েই এই অধিকারের বৈষয়িক ও মানসিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে; এবং সেইজন্যই, প্রলেতারিয়েতকে তার ক্ষমতাধীন সমস্ত উপায় দিয়ে উৎপাদন-উপায়ের উপর যৌথ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।” (ফ্রেডারিক এঙ্গেলস্, ফ্রান্স ও জার্মানির কৃষক সমস্যা)

৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচির উদ্দেশ্য ঠিক তার বিপরীত।

১১.সহিংসতার প্রশ্নে পেটিবুর্জোয়া শান্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গী

কর্মসূচি নং ২ (খ): “….. সহিংসতা ও এবং সন্ত্রাসবাদ দূরীকরণে এর উৎস চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।…. ”

‘সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ’- রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এর উপস্থিতি থেকে ধরে নেয়া যেতে পারে এখানে রাজনৈতিক সহিংসতার কথাই বলা হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদও একটি রাজনৈতিক ক্যাটাগরী। দুটিরই শ্রেণীগত চরিত্র আছে।

শাসক শ্রেণীর দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ, মজুরীর দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলি চালানো, কিংবা পানীয় জল সরবরাহের দাবিতে আন্দোলনরত নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী জনগণ কর্তৃক সরকার দলীয় সংসদ সদস্যকে ধাওয়া এবং লাঠি ও পাটকেল দিয়ে কষে মার লাগানোÑ এর প্রতিটিই রাজনৈতিক সহিংসতা। এই প্রতিটি ঘটনারই শ্রেণীগত ভিত্তি রয়েছে।

শ্রমিক শ্রেণীকে বুর্জোয়া শ্রেণী সর্বদাই কম বেশী সহিংসতা ও সন্ত্রাস দিয়ে দমিয়ে রাখে, আমরা এর বিরোধী। কিন্তু বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর সহিংস বল প্রয়োগের সব রকম পদ্ধতিই আমরা প্রয়োজনে ব্যবহারের পক্ষপাতি। বিপ্লবের সাথে, শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের সাথে সহিংসতার ও সন্ত্রাসের সম্পর্ক আমরা খোলাখুলিই স্বীকার করি। এটা অস্বীকার করবার অর্থ খোদ বিপ্লবকে, শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বকে অস্বীকার করা।

রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও সহিংসতা প্রশ্নে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গীটা পাওয়া যাবে এঙ্গেলসের কর্তৃৃত্ব প্রসঙ্গে প্রবন্ধে: “এসব ভদ্রলোকেরা কখনো কি বিপ্লব দেখেছেন? বিপ্লব হল নিঃসন্দেহেই সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যাপার- যত কর্তৃত্বমূলক হওয়া সম্ভব; বিপ্লব হল এমন একটা কাজ যা দ্বারা জনসাধারণের একাংশ বন্দুক, সঙ্গীন আর কামান মারফত, অর্থাৎ সর্বাপেক্ষা কর্তৃত্বমূলক উপায়ের সাহায্যে তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় অপরাংশের উপর। আর বিজয়ী দলকে অবশ্যই তার শাসন বজায় রাখতে হবে সন্ত্রাসের [terror] মাধ্যমে, যে বিজয়ী দলের অস্ত্র প্রতিক্রিয়াশীলদের মনে সঞ্চার করে ত্রাসের। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জনগণের কর্তৃত্ব প্রয়োগ না করলে প্যারিস কমিউন কি একদিনের জন্যও টিকে থাকত? এই কর্তৃত্ব যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ করা হয় নি বলে কমিউনকে ভর্ৎসনা করাই বরং উচিত নয় কি?”

আর ৫ বাম দল কিনা ‘জনগণের বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে’ ‘অস্থায়ী বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা’ করে গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসবে সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের উৎস কোথায়!

১২.মজুরি বৃদ্ধির পেটি বুর্জোয়া পথ

শুরুতে মজুরি সম্পর্কে সংক্ষেপে খানিকটা আলোচনা করে নেয়া দরকার।

একজন শ্রমিক শ্রম-শক্তি বিক্রি করে মুদ্রায় যে দাম পান তা তাঁর প্রকৃত মজুরি নয়। প্রকৃত মজুরি হলো এর বিনিময়ে তিনি যে পরিমাণ পণ্য পেতে পারেন।

মুদ্রা মজুরি স্থির থাকলেও যদি আবশ্যিক পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায় তাহলে একজন শ্রমিক আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারবেন। অর্থাৎ তাঁর প্রকৃত মজুরি কমে গেলো, ভোগের পরিমাণ হ্রাস পেলো। আবার ধরা যাক, মুদ্রা মজুরি স্থির আছে কিন্তু বর্ধিত উৎপাদিকা শক্তির ফলে আবশ্যিক পণ্যের দাম কমেছে। একই মজুরি দিয়ে সেই শ্রমিক এখন আগের তুলনায় বেশি পণ্য কিনতে পারবেন। এবারে তাঁর প্রকৃত মজুরি বেড়ে গেলো, ভোগের পরিমাণও বৃদ্ধি পেলো। সুতরাং মুদ্রা মজুরি (nominal wage) আর প্রকৃত মজুরি (real wage) সমান নয়।

কিন্তু মুদ্রা মজুরি আর প্রকৃত মজুরি এই দুইয়ের মধ্যেই মজুরি শব্দটি সীমাবদ্ধ নয়। মজুরি সর্বোপরি নির্ধারিত হয় পুঁজিপতির মুনাফার সাথে সম্পর্কিতভাবে। অন্য কথায়, মজুরি একটি আনুপাতিক, আপেক্ষিক পরিমাণ।

প্রকৃত মজুরি পণ্যের দামের তুলনায় শ্রম-শক্তির দামকে প্রকাশ করে। আর আপেক্ষিক মজুরি (relative wage) প্রকাশ করে শ্রমিকের শ্রম দ্বারা সৃষ্ট নতুন মূল্যে পুঁজির ভাগের তুলনায় সেই শ্রমের ভাগটুকুকে।

প্রকৃত মজুরি স্থির থাকলে বা বৃদ্ধি পেলেও আপেক্ষিক মজুরি কমে যেতে পারে। ধরা যাক, বর্ধিত উৎপাদিকা শক্তির ফলে শ্রমিকের বেঁচে থাকার আবশ্যিক পণ্য সমূহের দাম ২/৩ ভাগ (৬৭%)  হ্রাস পেয়েছে এবং তুলনায় মজুরি হ্রাস পেয়েছে ১/৩ ভাগ (৩৩%)। শ্রমিক এখন আগের তুলনায় অধিক পণ্য কিনতে পারবে, তার ভোগের পরিমাণ বাড়বে, অর্থাৎ তার প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি পেলো। একই সময়ে পুঁজিপতির মুনাফা শ্রমিকের মজুরি যতটুকু হ্রাস পেয়েছে ততটুকুই বেড়ে গেলো। অর্থাৎ শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি বাড়লেও তার আপেক্ষিক মজুরি হ্রাস পেয়েছে এবং পুঁজিপতির মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে। পুঁজিপতির অবস্থান শ্রমিকের তুলনায় আরো শক্তিশালী হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ও সহজবোধ্য আলোচনা পাওয়া যাবে মার্কসের মজুরি-শ্রম ও পুঁজি এবং মজুরি দাম মুনাফা লেখা দুটিতে।

এবারে আসা যাক ৫ বাম দলের মজুরি বৃদ্ধির কর্মসূচিতে।

কর্মসূচি নং ৪ (ঘ)-তে জনগণের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ৫ বাম দল: “জনগণের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে দ্রব্যমূল্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।”

আমরা ধরে নিচ্ছি ‘প্রকৃত আয়’ বলতে প্রকৃত মজুরির কথা বুঝিয়েছে ৫ বাম দল। কঠোরভাবে বা নরমভাবে যেভাবেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হোক না কেন তা দিয়ে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি করা যাবে না। এর দ্বারা শুধু প্রকৃত মজুরি হ্রাসকেই সাময়িকভাবে ঠেকিয়ে রাখা যাবে। আর একটু আগেই আমরা দেখেছি কিভাবে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি পেলেও আপেক্ষিক মজুরি হ্রাস পেতে পারে এবং পুঁজিপতির মুনাফা বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি পেলেও জাতীয়ভাবে সৃষ্ট মোট উদ্বৃত্ত মূল্যে পুঁজিপতির মুনাফার তুলনায় শ্রমিকের মজুরীর অংশ হ্রাস পেতে পারে; যে সময় শ্রমিকের ভোগের বৃদ্ধি ঘটছে ঠিক সে সময়টাতেই শ্রমিকের আপেক্ষিক সামাজিক অবস্থানের অবনতি ঘটছে আর পুঁজিপতির অবস্থান আরো শক্তিশালী হচ্ছে। সুতরাং ৫ বাম দলের এই কর্মসূচি ক্ষেত্র বিশেষে শ্রমিকের ভোগের পরিমাণ যাতে হ্রাস না পায় তার নিশ্চয়তা ছাড়া অন্য কিছু নয়, পুঁজিপতির মুনাফা হ্রাস ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

৫ বাম দলের কর্মসূচি দেখে মনে হয় মজুরী বৃদ্ধির জন্য বা মজুরী হ্রাসের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের আর সংগ্রামের প্রয়োজন হবে না, সরকারি দাম নিয়ন্ত্রণ দপ্তরই শ্রমিকদের হয়ে তা করে দেবে! হয় তারা অতি চালাক, নয়তো এ বিষয়ে তাদের বিশেষ কোন ধারণাই নেই।

১৩.পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সম্পর্কে মার্কস ও এঙ্গেলস্

“[পেটি বুর্জোয়ারা] কেবল বিদ্যমান সমাজকে নিজেদের জন্য যতটুকু সম্ভব সহনীয় ও আরামপ্রদ করার অভিকাঙ্খী। সুতরাং সবকিছুর ওপরে তাদের দাবি আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং করের মূল বোঝাটা বৃহৎ ভূস্বামী ও বুর্জোয়াদের ওপর স্থানান্তর। তাদের আরো দাবি সরকারি ঋণ ব্যবস্থা চালু ও মহাজনী নিষিদ্ধ করে ছোট পুঁজির ওপর বৃহৎ পুঁজির চাপ অপসারণ; আর সামন্তবাদের পরিপূর্ণ অবসান ঘটিয়ে ভূমিতে বুর্জোয়া সম্পত্তি সম্পর্ক চালু। ……

“……… শ্রমিকদের প্রশ্নে সবকিছুর ওপরে একটি বিষয় নিশ্চিত: আগের মতই তাদের মজুরি শ্রমিকই থাকতে হবে। তবে, গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়ারা শ্রমিকদের জন্য আরো ভালো মজুরি ও নিরাপত্তা চায়, এবং তা অর্জনের আশা করে রাষ্ট্রীয় চাকুরি বৃদ্ধি ও কল্যাণ ব্যবস্থা মারফত; সংক্ষেপে, তাদের আকাঙ্খা শ্রমিকদের অল্প-বিস্তর ছদ্মবেশী দয়া-দাক্ষিণ্যের ঘুষ দিয়ে আর বিদ্যমান অবস্থাকে সাময়িকভাবে সহনীয় করে তুলে তাদের বিপ্লবী শক্তিকে ভেঙে দেয়া।” (মার্কস ও এঙ্গেলস্, কমিউনিস্ট লীগের কাছে কেন্দ্রীয় কমিটির বক্তব্য, মার্চ ১৮৫০)

“১৮৪৮ সালে যাঁরা বুর্জোয়া গণতন্ত্রী বলে নিজেদের প্রচার করেছিলেন, আজ তাঁরা আনায়াসেই নিজেদের সোশ্যাল-ডেমোক্রাট বলে ঘোষণা করতে পারেন: প্রথমোক্তদের কাছে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র যেমন দুর্লভ সুদুরের বস্তু ছিল, শেষোক্তদের কাছে পুঁজিবাদের উচ্ছেদও ঠিক তেমনই, অতএব, বর্তমান রাজনীতিতে তার মোটেই কোন গুরুত্ব নেই, যতখুশি আপোস, মীমাংসা ও জনহিতৈষা চালানো যায়। প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার মধ্যে শ্রেণী-সংগ্রামের বেলাতেও ঠিক একই ব্যাপার। এই সংগ্রামকে কাগজে-পত্রে স্বীকার করা হচ্ছে, কারণ এর অস্তিত্ব আর অস্বীকার করার উপায় নেই; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে একে চেপে যাওয়া হচ্ছে, জোলো করে দেওয়া হচ্ছে, পাতলা করে দেয়া হচ্ছে। সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি হওয়া চলবে না, বুর্জোয়াদের অথবা অন্য কারও ঘৃণা অর্জন করা তার চলবে না; তার কাজ হবে সর্বোপরি বুর্জোয়াদের মধ্যে জোরালো প্রচার কাজ চালানো। যে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলি দেখে বুর্জোয়ারা ভয় পায় এবং যেগুলি হাজার হোক আমাদের জীবদ্দশায় তো আর লাভ করা যাবে না, সেগুলির ওপর জোর না দিয়ে বরং জোর দেওয়া উচিত পেটি বুর্জোয়া জোড়াতালি সংস্কারের উপর, যা পুরাতন সমাজব্যবস্থার পেছনে নতুন ঠেকা দিয়ে হয়তো অন্তিম চূড়ান্ত বিপর্যয়কে ক্রমে ক্রমে একটু একটু করে যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ অবলুপ্তির পদ্ধতিতে পরিণত করতে পারবে।”(মার্কস ও এঙ্গেলস্, বেবেল, লিবক্লেখত, ব্রাকে প্রমুখের প্রতি ‘সার্কুলার পত্র’, ১৮৭৯)

এভাবেই মার্কস-এঙ্গেলস্ তাঁদের কালে পেটি বুর্জোয়া সামাজিক-গণতন্ত্রীদের সমালোচনা করেছিলেন। আমাদের কালে আমাদের কর্তব্য হলো পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের রাজনৈতিকভাবে উন্মোচিত করা, শ্রমিক শ্রেণী ও শ্রমজীবী জনগণের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র চূর্ণ করা।

[সংস্কৃতি ২০০৯ ফেব্রুয়ারী সংখ্যা থেকে প্রকাশিত]

One response »

  1. বামদের দালালির কারনেই দেশে পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠতে পারে না —

    জবাব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: