বাঙলাদেশ লেখক শিবির-এর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের আহ্বান

 

 

সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন

১.

বিশ্বের সকল জাতি, সমগ্র বিশ্বের জনগণ আজ এমনভাবে পরস্পর সম্পর্কিত যা ইতিহাসে অভূতপূর্ব। সমগ্র মানব সমাজের ভবিষ্যত আজ এক সূত্রে গ্রথিত। বিশ্বের কোন এলাকার কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কেই এখন আর উদাসীন থাকা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার কারণে। এ এমনই এক বাস্তবতা যা কোনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

২.

পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা মুনাফার জন্য শুধু শোষণ লুণ্ঠন ও যুদ্ধ-ই চালিয়ে যাচ্ছে তাই নয়, সর্বোচ্চ মুনাফার স্বার্থে এই ব্যবস্থা প্রকৃতির মধ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে করতে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যাতে মানব জাতির অস্তিত্ব পর্যন্ত বিপন্ন হয়েছে, মানব জাতি আজ ধ্বংসের মুখোমুখী হয়েছে। পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ আজ তাই শুধু শ্রমিকের ও শ্রমজীবী জনগণেরই শত্র“ নয়, তারা সমগ্র মানব জাতির শত্র“।

ঐতিহাসিকভাবে পুঁজিবাদ যেমন গণতন্ত্রের জন্ম দেয়, তেমনি পুঁজিবাদের সঙ্কট থেকে তৈরী হয় ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ শোষণ চালায় বন্দুকের নলের মুখে; বেপরোয়া মুনাফা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। ফ্যাসিবাদ শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, প্রশাসন থেকে নিয়ে নিরাপত্তা পর্যন্ত প্রত্যেক ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অর্থ হলো, এই প্রত্যেক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করা।

৩.

বিশ্বের দেশে দেশে যেভাবে সেভাবে বাংলাদেশেও বিভিন্ন দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পরিচালিত হচ্ছে।

১. সাম্রাজ্যবাদ স্থানীয় ও লোকজ সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ করছে। এদেশের সবচেয়ে বড় এবং ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক উৎসব ১লা বৈশাখ আজ সাম্রাজ্যবাদী এনজিও-কর্পোরেট গোষ্ঠীর বিজ্ঞাপনে ঢাকা পড়তে চলেছে, জনগণের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে তারা পরিণত করেছে বিক্রয়যোগ্য পণ্যেÑ সামাজিক উৎসবকে পরিণত করেছে বাণিজ্যিক উৎসবে।

২. সাম্রাজ্যবাদ এক বিকৃত সংস্কৃতিকে আধুনিক গণমাধ্যমের সহায়তায় অনবরত প্রচার করে চলেছে। সাম্রাজ্যবাদী বিকৃত সংস্কৃতি ইন্দ্রিয়কে ক্রমাগতভাবে উত্তেজিত করে যা কেবল বুঁদ হতে সাহায্য করে; মানুষকে যা শারীরিক ও মানসিকভাবে করে তোলে বিচ্ছিন্ন, আদর্শহীন ও লক্ষ্যবিহীনÑ নিছক পণ্যের ভোক্তা।

৩. সাম্রাজ্যবাদ সংস্কৃতিক্ষেত্রে সমন্বয়বাদ তথা ‘সিভিল সোসাইটি সংস্কৃতি’র বিস্তার ঘটাচ্ছে। এর মাধ্যমে ছাত্র, তরুণ সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক, তরুণ শিক্ষকদের বিভ্রান্ত করে ভিন্ন কাজে আটকে ফেলে, ব্যস্ত রেখে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক সংগ্রামের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। বড় পুঁজিপতিদের মালিকানাধীন দৈনিকের নিয়ন্ত্রণে ‘বন্ধুসভা’, ‘বিতর্ক চর্চা’, কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, মাদক ও এসিড বিরোধী আন্দোলন, ত্রাণ বিতরণ, গোল টেবিল বৈঠক, দুর্নীতি বিরোধী প্রচার ইত্যাদির নামে চলে এই রাজনীতিবর্জিত সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির চর্চা।

৪. সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ সব চাইতে বিপজ্জনক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃত ইতিহাস চেতনার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এই আগ্রাসনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দিক। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং তাদের এদেশীয় দালাল জমিদার ও মুৎসুদ্দীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় সংগঠিত ফকির-সন্ন্যাসী, কৃষক, শ্রমিক, বিভিন্ন জাতি ও জাতিসত্ত্বা সহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের বিদ্রোহ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ঐতিহ্য একালে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আমাদের শক্তির অন্যতম উৎস। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রকৃতি ইতিহাস পাঠ একেবারে উঠিয়ে দিয়ে শক্তির এই উৎসকে শুকিয়ে মারছে সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ।

৫. সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ তাদের লক্ষ্য অর্জনে পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ ব্যবহার করে। বিশ্বের দেশে দেশে পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী, জাতিবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদানকে সাম্রাজ্যবাদ বরাবরই ব্যবহার করে থাকে। যা কিছু মানুষকে বিভক্ত করে, পেছনে টেনে নেয়, অন্ধকারে ঠেলে দেয় আজকের দিনে সেটাই ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদ।

এই পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী সাংস্কৃতিক কর্মধারার বিকাশ ঘটাতে হলে সাহিত্য সঙ্গীত নাটক চিত্রকলা ইত্যাদির মাধ্যমেই সেটা করতে হবে এবং এসব কিছুর উপাদান আহরণ করতে হবে বাস্তব জীবন থেকে। লুটেরা, সন্ত্রাসী, চোর, ডাকাত, লম্পট, বেশ্যা ও ভাঁড় জাতীয় লোকেরা নয়, জনগণই এই শিল্প সাহিত্যের নায়ক। এই কাজ করতে গিয়ে জনগণের কাছে কোন “বানানো” প্রগতিশীল সংস্কৃতি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বিভ্রান্তিকর। জনগণ যাতে নিজেদের উদ্যোগে প্রগতিশীল সংস্কৃতি গঠন করতে সক্ষম হন এবং নিজেদের সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারেন এটাই হতে হবে প্রগতিশীল ও বিপ্লবী সাংস্কৃতিক কর্মধারার মূল লক্ষ্য।

৪.

পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ দেশে দেশে জনগণকে দিচ্ছে যুদ্ধ ও মৃত্যু। শোষণ ও নির্যাতন, পরাধীনতা ও দাসত্ব, অসাম্য ও অন্যায়। অসাম্য আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ লোকের আয় নীচের ৫৭ শতাংশ জনগণের আয়ের সমান! পৃথিবীর সর্বাধিক ধনী ৩ ব্যক্তির সম্পদের পরিমাণ সারা পৃথিবীর গরীব ১০ শতাংশ জনগণের সম্পদের থেকেও বেশী!

পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ যে জায়গায় পৌঁছেছে, অর্থনৈতিকভাবে সমগ্র পৃথিবী আজ যেভাবে একীভূত হয়ে পড়েছে তাতে মানব সমাজের সামনে শোষণ-বঞ্চনামুক্ত এক নতুন যুগের দুয়ার খুলে যাওয়ার কথা। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থাই মানব সমাজের এই অগ্রগতিকে অসম্ভব করে তুলেছে।

একমাত্র সমাজতন্ত্রই পারে মানব সমাজের ভবিষ্যত বিকাশ ও অগ্রগতিকে নিশ্চিত করতে, পারে জনগণের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে। কারণ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুনাফার জন্য উৎপাদন করা হয় না, মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে উৎপাদন করা হয়। এই ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে সকল মানুষের সর্বাঙ্গীন মানবিক বিকাশের ওপর।

৫.

বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে যখন ঘটনাবলী এগুচ্ছে উল্লম্ফনের মধ্য দিয়ে। পরিবর্তনের এক গভীর তাগিদ আজ সমগ্র বিশ্ব জুড়ে অনুভূত হচ্ছে। এটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার বিলোপ ছাড়া পৃথিবীতে কোন শান্তি আসতে পারে না। বিশ্ব জুড়ে জনগণ আজ উন্মূখ সার্বিক মুক্তির এক নতুন ভোরের প্রতিক্ষায়।

১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে যে ভ্রাতৃত্ববোধ, যে ঐক্য আমরা দেখেছি তা সম্ভব হয়েছিল জনগণের সামনে স্বাধীন সেক্যুলার বাংলাদেশের একটি উচ্চতর রাজনৈতিক লক্ষ্য হাজির ছিল বলেই। যে রাজনৈতিক লক্ষ্য দ্বারা জনগণ উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, মানুষকে যা সংকীর্ণতা আর আত্মপরতার পঙ্কিলতা থেকে টেনে তুলেছিল।

আজ আমাদের সামনে হাজির হয়েছে আরেকটি আরও উচ্চতর রাজনৈতিক লক্ষ্য। সাম্রাজ্যবাদ আর তার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত দেশীয় শোষক-শাসক শ্রেণী তথা ফ্যাসিবাদ উচ্ছেদ করে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য ও কর্তব্য। এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, এর চাইতে মহত্তম কর্তব্য আমাদের কালে আর হতে পারে না। আমাদের সকল সৃজনশীল ক্ষমতাকে আজ এই একটি লক্ষ্যেই কেন্দ্রীভূত করতে হবে। এই একটি লক্ষ্যেই নিয়োজিত করতে হবে আমাদের সকল সাংগঠনিক ক্ষমতাকে। এটা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব, এটা আমাদের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।

ইতিহাস আমাদের সামনে হাজির করেছে আমাদের কালের মহত্তম কর্তব্য। এই কর্তব্য পালনে অগ্রসর হতে বাঙলাদেশ লেখক শিবির বাংলাদেশের সকল শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মী, ছাত্র ও তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান জানায়। দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের প্রাক্কালে এই-ই আমাদের আহ্বান।

 

শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মী, ছাত্র ও তরুণদের প্রতি

বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের আহ্বান

১        ইতিহাস চেতনার বিকাশ ও বিস্তার ঘটান। জনগণের সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশ সাধনে ব্রতী হোন।

সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এদের সাথে আপোষ ও সমন্বয়ের ধারা প্রত্যাখ্যান করুন।

২        এনজিও-কর্পোরেট স্পন্সরড্ সাংস্কৃতিক তৎপরতা এবং দৈনিক পত্রিকার ‘বন্ধুসভা’ ধরনের দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শন ও প্রচার নির্ভর সাংস্কৃতিক তৎপরতা প্রত্যাখ্যান করুন।

৩       দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরুন।

৪        এক দলের পরিবর্তে আরেক দলকে ক্ষমতায় বসানোর নির্বাচনী রাজনীতির কাঠামো প্রত্যাখ্যান করুন। সমগ্র শাসক শ্রেণী উচ্ছেদের সংগ্রামকে সমর্থন দিন, এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করুন।

৫        সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম বেগবান করুন।

৬        বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের সদস্য হোন। শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলুন।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: