সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বিরোধী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ সংগ্রাম বিকশিত করুন

বাংলাদেশ আজ সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে জর্জরিত। শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই আগ্রাসন চলছে বিশ্বের দেশে দেশে। বিশ্বব্যাপী শোষণ নির্যাতন ও আগ্রাসনকে সহজ করার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদ আজ একদিকে নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পরিকল্পিতভাবে পাল্টে দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে চালাচ্ছে সরাসরি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। চারটি দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিত হচ্ছে।
১. স্থানীয় ও লোক সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ। আমাদের সবচেয়ে বড় এবং ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক উৎসব ১লা বৈশাখও আজ সাম্রাজ্যবাদী এনজিও-কর্পোরেট গোষ্ঠীর বিজ্ঞাপনে ঢাকা পড়তে চলেছে, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে তারা পরিণত করেছে বিক্রয়যোগ্য পণ্যেÑ সামাজিক উৎসব ক্রমেই পরিণত হচ্ছে বাণিজ্যিক উৎসবে। ।
২. ‘রোলারকোস্টার সংস্কৃতি’ বা ‘ডিজুস সংস্কৃতি’র মাতাল হাওয়া। এর লক্ষ্য তরুণ প্রজন্ম। সাম্রাজ্যবাদী এই সংস্কৃতি ইন্দ্রিয়কে ক্রমাগতভাবে উত্তেজিত করে যা কেবল বুঁদ হতে সাহায্য করেÑ তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে করে তোলে বিষন্ন-বিচ্ছিন্ন-অবসন্ন, আদর্শহীন ও লক্ষ্যহীন।
৩. ‘সিভিল সোসাইটি সংস্কৃতি’র বিস্তার। সংস্কৃতিক্ষেত্রে সমন্বয়বাদের চর্চাই এর আদর্শ। এর উদ্দেশ্য হলো ছাত্র, তরুণ সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক, তরুণ শিক্ষকদের বিভ্রান্ত করে, ভিন্ন কাজে আটকে ফেলে, ব্যস্ত রেখে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম বিকাশে বাধা সৃষ্টি করা। বড় পুঁজিপতিদের মালিকানাধীন দৈনিকের নিয়ন্ত্রণে ‘বন্ধুসভা’, ‘বিতর্ক চর্চা’, কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, মাদক ও এসিড বিরোধী আন্দোলন, ত্রাণ বিতরণ, গোল টেবিল বৈঠক, দুর্নীতি বিরোধী প্রচার ইত্যাদির নামে চলে এদের সংস্কৃতি চর্চা। সমস্যার মৌল প্রকৃতি ও প্রকৃত সমাধানকে চিহ্নিত না করে উপর উপর প্রলেপ দেওয়ার কাজই এরা করে।
৪. পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহের ব্যবহার। বিশ্বের দেশে দেশে পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী, জাতিবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদানকে সাম্রাজ্যবাদ বরাবরই ব্যবহার করে থাকে। ইরাকে শিয়া-সুন্নী বিরোধ সৃষ্টিতে, রুয়ান্ডায় হুটু-টুটসি দাঙ্গায়, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ‘কাদিয়ানী বিরোধী’ তৎপরতায় রয়েছে সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদদ। যা কিছু মানুষকে বিভক্ত করে, পেছনে টেনে নেয়, অন্ধকারে ঠেলে দেয় আজকের দিনে সেটাই ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদ।
বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে যখন ঘটনাবলী এগুচ্ছে উল্লম্ফনের মধ্য দিয়ে। সমগ্র বিশ্ব জুড়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভ ও ক্রোধ এমনভাবে বিস্তৃত আর গভীর হয়েছে যা কিছুদিন আগেও অনুমান করা যায় নি। পরিবর্তনের তাগিদ আজ সর্বব্যাপী। সমগ্র বিশ্বের জনগণ আজ উন্মূখ সার্বিক মুক্তির এক নতুন ভোরের প্রতিক্ষায়। এটা আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার ধ্বংস ছাড়া পৃথিবীতে কোন শান্তি আসতে পারে না।
১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে যে ভ্রাতৃত্ববোধ, যে একতাবদ্ধতা আমরা দেখেছি তা সম্ভব হয়েছিল জনগণের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের একটি উচ্চতর রাজনৈতিক লক্ষ্য হাজির ছিল বলেই। যে উচ্চতর রাজনৈতিক লক্ষ্য দ্বারা জনগণ উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, মানুষকে যা সংকীর্ণতা আর আত্মপরতার পঙ্কিলতা থেকে টেনে তুলেছিল।
আজ আমাদের সামনে হাজির হয়েছে আরেকটি আরও উচ্চতর রাজনৈতিক লক্ষ্য। সাম্রাজ্যবাদ আর তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য দেশীয় শোষক-শাসক শ্রেণী উচ্ছেদ করে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্য ও কর্তব্য। এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, এর চাইতে মহত্তম কর্তব্য আমাদের কালে আর হতে পারে না। আমাদের সকল সৃজনশীল ক্ষমতাকে আজ এই একটি লক্ষ্যেই কেন্দ্রীভূত করতে হবে। এই একটি লক্ষ্যেই নিয়োজিত করতে হবে আমাদের সকল সাংগঠনিক ক্ষমতাকে। এটা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব, এটা আমাদের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আমাদের যুগের প্রধান সংগ্রাম। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ন্যায়সঙ্গত। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মহত্তম।
ইতিহাস আমাদের সামনে হাজির করেছে আমাদের কালের মহত্তম কর্তব্য। এই কর্তব্য পালনে অগ্রসর হতে বাঙলাদেশ লেখক শিবির বাংলাদেশের সকল শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মী, ছাত্র ও তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান জানায়।
বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের আহ্বান
* সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশীয় এজেন্টদের বিরুদ্ধে দৃঢ় সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এদের সাথে সমন্বয়ের ধারা প্রত্যাখ্যান করুন।
* ইতিহাস চেতনার বিকাশ ও বিস্তার ঘটান। আমাদের ঐতিহ্যের অগ্রসরমান ধারাকে অবলম্বন করে এবং সারা বিশ্বের অগ্রসর ও বিকাশমুখী সংস্কৃতির উপাদান সমূহ আত্মস্থ করে জনগণের সাংস্কৃতিক জীবনের বিকাশ সাধনে ব্রতী হোন।
*দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরুন। বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের সাথে স্থানীয় ভিত্তিতে যুক্ত হোন।
*এনজিও-কর্পোরেট স্পন্সরড্ সাংস্কৃতিক তৎপরতা এবং দৈনিক পত্রিকার ‘বন্ধুসভা’ ধরনের দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শন ও প্রচার নির্ভর সাংস্কৃতিক তৎপরতা প্রত্যাখ্যান করুন।
*এক দলের পরিবর্তে আরেক দল নয়, সমগ্র শাসক শ্রেণী উচ্ছেদের সংগ্রামকে সমর্থন দিন, সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করুন।
* বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের সদস্য হোন।

১লা বৈশাখ ১৪১৩

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: