১৮৫৭ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৫০ বছর পূর্তিতে গৃহীত প্রস্তাবাবলী

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ তথা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের ১৫০ বছরপূর্তিতে বাঙলাদেশ লেখক শিবির নিম্নলিখিত প্রস্তাবাবলী গ্রহণ করেছে:
১. বাঙলাদেশ লেখক শিবির ১৮৫৭-৫৯ সালে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে। একই সাথে ঐ যুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকলকে, বিশেষ করে বীর সিপাহীদের, গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।
২. বাঙলাদেশ লেখক শিবির ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং তাদের এদেশীয় দালাল জমিদার ও মুৎসুদ্দীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় সংগঠিত ফকির-সন্ন্যাসী, কৃষক, শ্রমিক, বিভিন্ন জাতি ও জাতিসত্ত্বা সহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের বিদ্রোহ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। ঔপনিবেশিক শাসন ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সেই সকল সংগ্রামের ঐতিহ্য ধারণ করে বর্তমানে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সকল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে।
৩. ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্তি পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দু’শ বছর ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের শাসন বজায় রাখতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা-পঙ্গু করা সহ কারাবন্দী, দ্বীপান্তর ছাড়াও নানা রকম নির্যাতন চালায়। এই সকল নিপীড়ন নির্যাতনের জন্য বাঙলাদেশ লেখক শিবির বর্তমান ব্রিটিশ সরকারকে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জোর দাবী জানাচ্ছে।
৪. ১৯৪৩ সালে তৎকালীন বাংলায় দুর্ভিক্ষে প্রায় অর্ধকোটি মানুষের মৃত্যুসহ ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষে ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষের মৃত্যু ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে গৃহীত ও অনুসৃত নীতির ফলাফল। সেই হিসেবে এ সকল মৃত্যু ছিল পরিকল্পিত (ফবষরনবৎধঃব) গণহত্যা তথা জাতিগত হত্যাকান্ড (বঃযহরপ শরষষরহম)। বাঙলাদেশ লেখক শিবির এই জাতিগত হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে নিয়ে বর্তমান ব্রিটিশ সরকারকে এ অঞ্চলের জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জোর দাবী জানাচ্ছে।
৫. বাঙলাদেশ লেখক শিবির প্রায় দু’শ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনকালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক ভারতবর্ষের ধন-সম্পদ, মহামূল্যবান প্রতœতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের লুটতরাজের তীব্র নিন্দা করছে। এই সকল লুণ্ঠিত সম্পদ এবং প্রতœতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহের হিসেব ও তালিকা প্রণয়ন করতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির বিজ্ঞজনদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের তাগিদ অনুভব করছে। এই হিসেব ও তালিকা প্রণয়নের ভিত্তিতে সকল লুণ্ঠিত সম্পদ এবং প্রতœতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এ অঞ্চলের দেশসমূহের সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছে।
৬. বর্তমান বাংলাদেশ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এই মহান ঐতিহ্যের সঙ্গে জনগণকে উপযুক্তভাবে ও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত করার জন্য ইতিহাস চেতনার বিকাশ ও বিস্তার একান্ত প্রয়োজনীয়। সেই লক্ষ্যে ১৮৫৭-৫৯ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানসহ এ অঞ্চলের জনগণের উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য শিশু-কিশোর ও তরুণ শিক্ষার্থীদের সামনে অতিগুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা প্রয়োজন। বাঙলাদেশ লেখক শিবির এ জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সকল পাঠ্যসূচীতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছে।
৭. বাঙলাদেশ লেখক শিবির ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট ‘ব্রিটিশ কমনওয়েলথ’ থেকে বাংলাদেশকে প্রত্যাহার করে নিতে সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছে এবং এই লক্ষ্যে সোচ্চার হতে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সকল সংগঠন ও ব্যক্তির কাছে আহ্বান জানাচ্ছে।
৮. বাঙলাদেশ লেখক শিবির বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সমূহকে, বিশেষ করে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগকে, গভীর মনোযোগ ও দায়িত্ব সহকারে ১৮৫৭ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৫০ বছর পূর্তি পালনের আহ্বান জানাচ্ছে।
৯. বাঙলাদেশ লেখক শিবির এই প্রস্তাবাবলীর সমর্থনে স্ব-উদ্যোগে কর্মসূচী গ্রহণ করার জন্য সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সকল সংগঠন ও ব্যক্তির কাছে আহ্বান জানাচ্ছে।
১ জুন, ২০০৭

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: