Author Archives: বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন

জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে আসুন!

ভারত-আমেরিকার তাবেদার সরকার নয়

জনগণের হাতে ক্ষমতা চাই,

জনগণের সরকার ও সংবিধান চাই

বাংলাদেশ আজ এক দূর্যোগপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। পরিস্থিতি কতোটা ভয়াবহ তা যাঁরা রাজনীতির খোঁজ খবর রাখেন তাঁরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় কোন দল গদীনসীন হবে তা এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে ভারত, আমেরিকাসহ বৈদেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্রের ওপর। এজন্য দফায় দফায় মিটিং হচ্ছে গুলশান-বারিধারার কূটনৈতিক পাড়ায়, ভারতের দিল্লিতে আর আমেরিকার ওয়াশিংটনে। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মজিনা আর ভারতের রাষ্ট্রদূত পংকজ শরণের রাজনৈতিক তৎপরতা সকল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। অবস্থা এমনই যে, রাষ্ট্রদূত মজিনা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গিয়ে ভারতের সাউথ ব্লকের আমলাদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে আগামীতে কারা সরকার গঠন করবে এই নিয়ে। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাকে ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে। এ কথাও প্রকাশ পেয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশে আগামীতেও এমন সরকার গদিনসীন দেখতে চায় যে সরকার হবে ভারতের অনুগত ও পদলেহী। যেন বাংলাদেশ ভারতের কোন অঙ্গরাজ্য! সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাও আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে এমন সরকারকে গদিনসীন দেখতে চায় যে হবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার তল্পিবাহক। নির্বাচন নিয়ে ভারত-আমেরিকার মতবিরোধের খবরও বাংলাদেশ ও ভারতের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ভারতের আশ্রয় নিয়েছে এবং বিএনপি-জামায়াত আমেরিকার আশ্রয় নিয়েছে।

সংগ্রামী দেশবাসী,

ভারত সরকার, ভারতের শাসকশ্রেণী, ভারতের একচেটিয়া বৃহৎ পুঁজি অর্থাৎ ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ সে দেশের শ্রমিক-কৃষক আদিবাসীসহ বিভিন্ন জাতির ওপর চরম শোষণ-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৪৭ সালে এ উপমহাদেশ হতে প্রত্যক্ষ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারতীয় পুঁজি ক্রমশঃ একচেটিয়া পুঁজিতে পরিণত হয়ে সাম্রাজ্যবাদী রূপ ধারণ করেছে। কাশ্মির, দক্ষিণ ভারত, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল, মিজোরাম প্রভৃতি রাজ্যের জনগণ ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের শোষণের কারাগার থেকে মুক্তি চান। ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশধারী এই ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়সহ নিম্নবর্ণের হিন্দু, দলিত, তফসিল জাতিসমূহের দূর্দশাগ্রস্ত অবস্থা চেপে রাখা যাচ্ছে না। ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ নিজ দেশের জনগণের ওপর যেমন, তেমনি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের ওপর তার একচেটিয়া পুঁজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া।

২০০৫ সালে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কনডোলিজা রাইস ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বলেছিলেন, এখন থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখভাল করবে ভারত। এর বিরুদ্ধে সেদিন ‘স্বাধীন’ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন খালেদা জিয়ার সরকার কোন প্রতিবাদ জানায়নি। আমেরিকার কাছ থেকে দায়িত্ব পালনের অধিকার পেয়ে ভারত বাংলাদেশে এতটাই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে যে তাতে খোদ আমেরিকারই অসুবিধা হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বন্ধুগণ,

গত ৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার যেমন লুটেরা সন্ত্রাসী দুর্নীতিবাজ শোষক-শাসক শ্রেণীর শোষণ-লুণ্ঠনে নেতৃত্ব দিয়েছে তেমনি লুণ্ঠন দুর্নীতি নিরাপদ করতে দেশব্যাপী চালিয়েছে বেপরোয়া রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাস। এই দুর্নীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো শেয়ার মার্কেটের দুর্নীতি, পদ্মাসেতু দুর্নীতি, বিদ্যুৎ খাতে রেন্টাল-কুইক রেন্টালের দুর্নীতি, অস্ত্র ক্রয় দুর্নীতি, ব্যাংক লুটপাট প্রভৃতি।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ওপর মালিকদের চরম মজুরী শোষণ নিরাপদ করতে এ সরকার গঠন করেছে শিল্প পুলিশ-শিল্প গোয়েন্দা। গত ৫ বছরে বকেয়া বেতন-ওভার টাইমের টাকা আদায়ের দাবীতে সংগ্রামরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে ১০ জনের বেশি শ্রমিককে।

বিরোধী রাজনৈতিক দল, আন্দোলনকারী শিক্ষক, ছাত্র, সাংবাদিক, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগণ, তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলন, সভা-সমাবেশ প্রভৃতির ওপর সরকারের পুলিশ চালিয়েছে বর্বরোচিত হামলা।

২০১৩ সালের ৫-৬ মে গভীর রাতে মতিঝিল শাপলা চত্বরে ক্লান্ত ঘুমন্ত নিরস্ত্র ৪০ হাজার নাগরিকের বিরুদ্ধে ১০ হাজারের অধিক পুলিশ-র‍্যাব-বিজিবি সদস্যের অভিযানে দেড় লক্ষাধিক রাউন্ড গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে। এই অভিযানে নিহত-আহতদের প্রকৃত সংখ্যা সরকার গোপন রেখেছে। বিরোধী রাজনীতিকদের গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যা, আটক অবস্থায় নির্যাতন এ দেশে আজ স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এই লুটেরা সন্ত্রাসী দুর্নীতিবাজ সরকারকে রক্ষায় ভারত আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে কেন? এর উত্তর পাওয়া যাবে এই সরকারের বিগত ৫ বছরের কর্মকান্ডের মধ্যে। ভারতের সাথে এ সরকার একাধিক গোপন চুক্তি করেছে যা ‘হাসিনা-মনমোহন চুক্তি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। জাতীয় সংসদে এই চুক্তি যাতে উত্থাপন করতে না হয় সেজন্য সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে পরিবর্তন এনেছে। এই হাসিনা-মনমোহন চুক্তির বলে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর এবং আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে মালামাল নিয়ে যাওয়ার যে ব্যবস্থা হয়েছে তার মধ্যে এমন কোনো শর্ত নেই যে, ভারত সামরিক সরঞ্জাম বহন করবে না। ট্রানজিটের নামে সরকার ভারতকে কার্যতঃ করিডোর দিয়েছে। এই সরকার বিডিআর-কে বিলুপ্ত করেছে। ভারতের স্বার্থে সন্ত্রাস দমনের নামে আঞ্চলিক টাস্ক ফোর্স গঠন করে দেশে সাম্রাজ্যবাদী ভারতের সামরিক উপস্থিতির সুযোগ করে দিয়েছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় মন্ত্রীরা ভারতের হয়ে সাফাই গেয়েছেন। সাফাই গেয়েছেন আন্তর্জাতিক নদী বরাকের টিপাইমুখে ভারত কর্তৃক এক তরফা বাঁধ নির্মাণে। ভারত এখন বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবন ধ্বংস করে কয়লা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে।  সমুদ্রের দুটি তেল-গ্যাস ব্লক ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

এছাড়া হাসিনা সরকার সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সাথে নানা গোপন সামরিক চুক্তি সম্পাদন করে দেশে আমেরিকান সৈন্যদের বিনা পাসপোর্ট, বিনা ভিসায় আগমনের ব্যবস্থা করেছে। চট্টগ্রামে মার্কিন নৌঘাঁটি নির্মাণ ও চট্টগ্রাম বন্দরে মার্কিন রণতরী ৭ম নৌবহর নোঙড়ে সম্মতি দিয়েছে। যৌথ মহড়ার নামে বাংলাদেশে মার্কিন সৈন্যদের উপস্থিতি এই অঞ্চলের  নিরাপত্তা বিপন্ন করে তুলেছে। শতভাগ রপ্তানির সুযোগ রেখে সমুদ্রের দুটি তেল-গ্যাস ব্লক মার্কিন কোম্পানি কনকো ফিলিপসের হাতে তুলে দিয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হাসিনা সরকারের এই সাম্রারাজ্যবাদের পদলেহী ভূমিকা বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী ভারত-আমেরিকার খোলাখুলি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসতে সাম্রাজ্যবাদী ভারত-আমেরিকার পদলেহনে উন্মুখ। আগামীতে গদিনসীন হলে এরাও অতীতের মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পদলেহন করবে। হাসিনা সরকারের দেশবিরোধী, জনগণের সার্বভৌমত্ব বিনাশী নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে। এরা সকলেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। কারণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তা ছাড়া লুটেরা সন্ত্রাসী দুর্নীতিবাজ শোষক-শাসক শ্রেণীর কোনো সরকারের পক্ষে নিজ দেশের শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত জাতি ও জনগণের ওপর শোষণ-নির্যাতন চালিয়ে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়।

হাসিনা সরকার সভা-সমাবেশ মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশে এক অঘোষিত জরুরী অবস্থা জারী রেখেছে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশকে এক পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এ কাজ তারা করেছে এজন্য যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেন তারা ক্ষমতায় পুনরায় ফিরে আসতে পারে। কেননা গত ৫ বছরে সরকারের দুর্নীতি, লুণ্ঠন, সন্ত্রাস, দুঃশাসন দেশবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে এ সরকারের পক্ষে পুনরায় ‘নিরপেক্ষ’ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে আসা সম্ভব নয়। সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিধান বাতিল করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন ‘সর্বদলীয় সরকার’ গঠন করে তার অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত ও চিরস্থায়ী করতে হাসিনা সরকারের এই তৎপরতা দেশবাসীর কাছে আজ উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। হাসিনা সরকার তাই দেশময় বিরোধী রাজনৈতিক দল, শাসক-শোষক শ্রেণী বিরোধী শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র, পেশাজীবী, ক্ষুদ্র জাতিসমূহের আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় বাহিনী দিয়ে সন্ত্রাস-নির্যাতন চালাচ্ছে। অন্যদিকে শোষক-শাসক শ্রেণীর অপর বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে হরতালের নামে দেশময় নৈরাজ্য সৃষ্টি করে জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। জনমনে আতঙ্ক ও চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

সংগ্রামী দেশবাসী,

আগের দিনে আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর রাখার দরকার হতো না। কিন্তু আজকের দিনে বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে তা জানা থাকা দরকার। আমাদের দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি আজ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের সাথে, বিভিন্ন দেশের জনগণের সাথে নানা সূত্রে সম্পর্কিত। দেশে দেশে পুঁজিবাদী শোষণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণ লড়াই করছেন। আমাদের দেশেও এই লড়াই চলছে।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী প্রভৃতি হলো বড়লোক শোষক-শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক দল। গত ৪২ বছর ধরে এরাই জনগণকে শোষণ-শাসন করে এসেছে; আমেরিকা, ভারত, সৌদি আরব প্রভৃতি বৈদেশিক শক্তির সেবা করে এসেছে। এছাড়া রয়েছে ধর্মের নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তথাকথিত বামপন্থী-কমিউনিস্ট নামে দল, এরা বড়লোক শোষক-শাসকশ্রেণীর রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে চলেছে। এরা সকলেই বাংলাদেশের বিদ্যমান শোষণ নির্যাতন বৈষম্যের শাসন কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে তৎপর। এই কাঠামো আজ সংকটের মুখে, ভাঙনের মুখে। সংস্কারের মাধ্যমে এই অবস্থার মৌলিক কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়; ১৬ কোটি শ্রমিক-কৃষকসহ নিপীড়িত জাতি ও জনগণের মুক্তি সম্ভব নয়।

বন্ধুগণ,

জনগণের অধিকার কেড়ে নেয়ার, জনগণের সার্বভৌমত্ব খর্ব করার কোনো আইন ও সংবিধান জনগণ মানতে বাধ্য নন। সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধস ও তাজরীনে আগুনে পুড়ে হাজার হাজার শ্রমিককে হত্যা শ্রমজীবী মানুষের ঘুম ভেঙ্গে দিয়েছে। শ্রমিক-কৃষকের ঘুম ভাঙাকে শোষক-শাসকশ্রেণী ভয় পায়, নানা কালাকানুন করে তারা তাই জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে। কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে না দিয়ে শ্রমিকদের গোলাম বানিয়ে রাখতে চায়। বাজার দরের সাথে, জীবন ধারনের ব্যয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে এদেশে শ্রমিকদের মজুরী নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় শোষক-শাসক মালিকশ্রেণীর সর্বোচ্চ মুনাফা বহাল রাখার স্বার্থে। এই শোষক-শাসকরা মনে করে শ্রমিকদের যে মজুরি তারা দেবে তাই-ই শ্রমিকদের মেনে নিতে হবে! তারা মনে করে উৎপাদনে ব্যবহৃত শ্রমশক্তির মূল্য নির্ধারণে শ্রমিকশ্রেণীর কোনো বক্তব্য থাকতে পারে না!! এই মজুরি দাসত্বের সমাজ আমরা চাই না। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা এই শোষণ-নির্যাতনকে টিকিয়ে রেখেছে এবং জনগণের সার্বভৌমত্বকে কেড়ে নিয়েছে, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল সেই পুঁজিবাদী শোষণ-শাসন ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করার সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রামে জয়ী হতে, জনগণের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেয়া লুটেরা সন্ত্রাসী দুর্নীতিবাজ শাসক-শোষক শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদকে উচ্ছেদ করতে দরকার দেশজুড়ে জনগণের ঐক্য, সংগঠন ও সংগ্রাম।

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল মনে করে প্রচলিত সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের হাতে কোনো ক্ষমতা আসবে না। জনগণের হাতে ক্ষমতা আনার পথ হচ্ছে জাতীয় মুক্তির ১৮ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে গণআন্দোলনের পথ, গণসংগ্রামের পথ। এই পথ ধরেই শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত জাতিসমূহের দেশজোড়া গণরাজনৈতিক অভ্যুত্থানের ওপর দাঁড়িয়ে জনগণের সরকার, সংবিধান ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আসুন, জাতীয় মুক্তির ১৮ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সর্বত্র জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কমিটি গঠন করি। জনগণের হাতে ক্ষমতা আনতে তথা জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় দেশজুড়ে সংগ্রাম গড়ে তুলি। আওয়াজ তুলুন : ভারত-আমেরিকার তাবেদার সরকার নয়, জনগণের হাতে ক্ষমতা চাই, জনগণের সরকার ও সংবিধান চাই।

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

কার্যালয় : ৩৩ তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা (৫ম তলা), ঢাকা- ১০০০। ফোন : ০১৭১৩০৬৩৭৭৬।                                 ১০.১১.২০১৩

1417731_552903171452512_1309617386_o

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ ও জাতীয় গণফ্রন্ট-এর সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য ও আন্দোলন কর্মসূচি

 ১১ জুন ২০১৩, ৩৩ তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা (৫ তলা), ঢাকা

শ্রমিক কৃষকসহ নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সরকার-সংবিধান ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ রুখে দাঁড়ান

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

দেশে আজ সংসদীয় শাসনের আড়ালে একদলীয় আওয়ামী-বাকশালী ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকারের গত সাড়ে ৪ বছরের দুর্নীতি লুণ্ঠন সন্ত্রাস গণহত্যা দেশবিরোধী কর্মকান্ড তাদের জনগণ থেকে এতোটাই বিচ্ছিন্ন করেছে যে, তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা তারা দেখতে পাচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে তারা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। সভা-সমাবেশ-মিছিলে পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসী দিয়ে বাধা দিয়ে ও হামলা করে সংগঠন করার গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে। সরকারবিরোধী নেতবৃন্দকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার, রাষ্ট্রীয় বাহিনী দ্বারা সরকার বিরোধীদের গুম, ক্রসফায়ারের নামে হত্যা, গ্রেফতার ও রিমান্ডের নামে নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক কাজ হয়ে উঠেছে। একইসাথে সরকার সংবাদপত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপসহ নানাভাবে নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। এখন নিরাপত্তার অজুহাত তুলে সরকার রাজধানী ঢাকায় সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। অন্যদিকে, শাসক-শোষকশ্রেণীর ক্ষমতা বহির্ভূত অংশ, জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে এবং জাতীয় ও জনজীবনের সমস্যা দূরীকরণে কোন কর্মসূচী গ্রহণ না করে শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবীতে জ্বালাও-পোড়াও-হরতাল করছে। পঞ্চদশ সংশোধনীসহ সংবিধানের অগণতান্ত্রিক ধারা ও কালাকানুনের কোন রাজনৈতিক বিরোধিতা না করার মাধ্যমে তারা কার্যতঃ সরকারের ফ্যাসিবাদী নীতিকে সমর্থন জানিয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে হাসিনা সরকারের সুবিধাবাদী ও প্রতারণামুলক ভূমিকাকে কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের নেতৃবৃন্দের আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার বানচাল করতে দেশময় নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চলেছে। পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে সরকার পুলিশ দিয়ে গুলি করে ব্যাপক হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছে। সরকারের ফ্যাসিস্ট হামলা কোথাও কোথাও জনগণের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। একে বিএনপি-জামায়াত ব্যবহার করছে। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলাম নামক সংগঠন চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও নারী বিদ্বেষী ১৩ দফা দাবী তুলে ঢাকায় সমাবেশ করেছে। ধর্ম অবমাননার কথা বলে তারা কয়েকজন ব্লগারের শাস্তির দাবি করেছে। হাসিনা সরকার তাদের সাথে এ বিষয়ে হাত মিলিয়ে কয়েকজন ব্লগারকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু হেফাজতের লক্ষ্য একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করা এবং অপরদিকে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হওয়া। প্রথম থেকেই সরকার এই বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলিভাবে জনগণের কাছে যায়নি, একে শ্রেণীগত কারণে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করেনি। গত ৫-৬ মে ঢাকায় সরকারের নির্দেশে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গভীর রাতে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবির ১০ হাজার সদস্যের সম্মিলিত বাহিনী অপারেশন শাপলা অভিযান চালায়। এ অভিযানে কয়েক লাখ রাউন্ড গুলি, টিয়ারসেল, গ্রেনেড নিক্ষেপ করে রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছে। এ অভিযানে একজনেরও মৃত্যু হয়নি বলে সরকার বলেছে। বাস্তবত সরকার হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পূর্ণ গোপন করেছে। আওয়ামী লীগের লেজুড় বামপন্থী দলগুলি সা¤্রাজ্যবাদ-পুজিবাদ নয়, ধর্মীয় মৌলবাদ প্রধান বিপদ এই আওয়াজ তুলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগ এই দুটিকেই বাঁচানোর চেষ্টা করছে। একই সাথে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদকে মদদ যোগাচ্ছে। সরকারের বাইরে বামপন্থী দল ও জোট ‘৭২-এর সংবিধানকে মহিমান্বিত করে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শক্তি যুগিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে সরকার তার অব্যাহত গণবিরোধী কর্মকান্ডের দ্বারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকারের জনসমর্থন প্রতিদিনই হ্রাস পাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, চরম মজুরী শোষণ, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, বেকারত্ব, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সারাদেশে সরকার দলীয় সন্ত্রাস-টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি, শিক্ষাঙ্গনে সরকার দলীয় সন্ত্রাস ও প্রশাসনিক নির্যাতন, পার্বত্য জেলাসমূহে সেনাশাসন ও সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ওপর নির্যাতন, নারী নির্যাতন, আগুনে পুড়ে-ভবন ধসে হাজার হাজার গার্মেন্ট শ্রমিককে হত্যা ও নির্যাতন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধদের ঘরবাড়ি উপাসনালয়ে হামলা, রাষ্ট্রের ভূমিদস্যুতায় কৃষকের জমি বেদখল, উত্তরবঙ্গে সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি জাতিসত্তার উপর হামলা-জমি দখল, সরকার-প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় খাল-নদী-বিল দখল, প্রশাসনিক দুর্নীতি, বিদ্যুৎ জ্বালানী তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, রেলের ভাড়া দ্বিগুণ বৃদ্ধি, সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা, বিশ্বজিৎ হত্যা প্রভৃতি ঘটনা জনজীবনকে নিরাপত্তাহীন ও দুর্বিষহ করে তুলেছে। এর পাশাপাশি রয়েছে সরকারের বিশাল আকারে দুর্নীতি ও লুণ্ঠন পদ্মাসেতু নিয়ে দুর্নীতি, রেন্টাল-কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট, রেলের দুর্নীতি-নিয়োগ বাণিজ্য, শেয়ারবাজার, ডেসটিনি, হলমার্ক ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট, ব্যাংক থেকে অর্থলোপাট প্রভৃতি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা বর্তমানে দেশকে গ্রাস করে ফেলেছে। দেশের তেল, গ্যাস ও কয়লা জাতীয় সম্পদের ওপর সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানির দখল কায়েম হয়েছে। শাসকশ্রেণীর সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় বর্বর গার্মেন্ট মালিকদের চরম মজুরী শোষণ কায়েম রাখতে বাংলাদেশে শ্রমিক গণহত্যা চলছে। মাত্র ৫ মাসে সাভারের রানা প্লাজা ধসে, আশুলিয়ায় তাজরিন ফ্যাশন ও মোহাম্মদপুর স্মার্ট গার্মেন্টে আগুনে পুড়ে দুই সহস্রাধিক শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন, নিখোঁজ রয়েছেন কয়েকশত, আহত-পঙ্গু হয়েছে কয়েক হাজার। শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রধানতঃ সরকার ও রাষ্ট্রের। সরকার-রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনে শুধু ব্যর্থ নয়, চরম উদাসীন ও গার্মেন্ট মালিকদের রক্ষায় ব্যস্ত। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে হাসিনা সরকার বাংলাদেশকে একই সঙ্গে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবলয়ের অন্তর্গত করেছে এবং ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশীদার করেছে। এর মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী বেনামি যুদ্ধের (ঢ়ৎড়ীু-ধিৎ) বিপজ্জনক ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সাথে সাম্রাজ্যবাদী বেনামি যুদ্ধ (proxy-war) এখন জড়িয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে হাসিনা সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণী ও নিপীড়িত জাতি সমূহের স্বাধীনতা ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম দমনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সাথে হাত মিলিয়েছে।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে সরকার কর্তৃক মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালত গঠন, আইনের ফাঁক-ফোকর, অযোগ্য আইনজীবী নিয়োগ, চার্জ গঠন, তথ্য-প্রমাণ, দলিল-দস্তাবেজ, সাক্ষ্য, সওয়াল জবাব প্রতিক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপক্ষের নিয়োজিত প্রসিকিউটর এবং মামলার তদন্তকার্য কর্মকর্তাদের অবহেলাই ইঙ্গিত করছে যে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় ছিল পরিকল্পিত। সরকার-জামায়াত গোপন আঁতাত এভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়লে শাহবাগে তরুণরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তরুণদের এই বিক্ষোভ ছিলো ন্যায়বিচারের দাবিতে। কিন্তু সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের লেজুড় বামপন্থী দলসমূহ, দালাল বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এ বিক্ষোভকে সামাল দেয় এবং সরকারের আর্থিক-প্রশাসনিক সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতায় একে সরকারবান্ধব এক বিক্ষোভে পরিণত করে। শাহবাগ আন্দোলনের প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টার সমর্থন ঘোষণাও দিল্লির ইচ্ছাকে জানান দেয়। শাহবাগ আন্দোলনে সরকারের সংশ্লিষ্টতা, সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকটি উন্মোচিত হয়ে পড়লে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কমে যায়।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,

এদেশে জনগণ দীর্ঘদিন শোষক-শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদ্ধতিতে সংগ্রাম করে আসছেন। প্রচলিত নির্বাচনের মাধ্যমে একের পর এক সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে। এইভাবে নির্বাচিত প্রত্যেকটি সরকারই জনগণকে দেয়া সকল প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণভাবে ভঙ্গ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে যে ব্যবস্থা ও শর্তের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে জনগণের ভোট প্রদানের এক মহড়া অনুষ্ঠিত হলেও এর মাধ্যমে কোনো প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এর মধ্য দিয়ে জনগণের হাতে কোন ক্ষমতা আসে না। তাই জনগণ আজ দেশের শাসন ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন চান। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ-ভারত ও তার দালাল শাসকশ্রেণীর শাসনের অবসান চান। আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টির রাজনীতির অবসান চান। জনগণের এই বিপ্লবী আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে আমরা ৪টি সংগঠন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ ও জাতীয় গণফ্রন্ট বিগত কয়েক বছর ধরে ইস্যুভিত্তিক যৌথ আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করে আসছি। বর্তমান সঙ্কটময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণের প্রতি আমাদের আহ্বান, আসুন, উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদকে রুখে দাঁড়াই। রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলি। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ-ভারত ও তার দালাল শাসক শ্রেণীকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে শ্রমিক কৃষক নিপীড়িত জাতি ও জনগণের গণতান্ত্রিক সরকার সংবিধান-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হই ও দেশজোড়া সংগ্রাম গড়ে তুলি। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা নিম্নোক্ত দাবিতে দেশব্যাপী দাবী দিবস, হাটসভা, পথসভা, জনসভাসহ আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা করছি।

১। ​ঢাকাসহ সারাদেশে সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা, বাধা প্রদান ও হামলা বন্ধ করতে হবে। সভা করতে পুলিশের অনুমতি গ্রহণের নির্দেশ বাতিল করতে হবে। ঢাকার মুক্তাঙ্গনকে সভা-সমাবেশের জন্য খুলে দিতে হবে।

২। ​সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীসহ সকল অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিল করতে হবে। দেশের সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করতে হবে।

৩।​অবিলম্বে বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইন, ৫৪ ধারা প্রভৃতি কালাকানুন বাতিল করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অঘোষিত সেনাশাসন অপারেশন উত্তরণ তুলে নিতে হবে।

৪। ​অবিলম্বে দৈনিক সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও অনলাইন মিডিয়া-সামাজিক মাধ্যমের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাতিল ও নিয়ন্ত্রণের পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে।

৫।​বিগত ৩ মাসে সারাদেশে পুলিশের গুলিতে তিনশতাধিক মানুষকে হত্যার তদন্ত ও বিচার করতে হবে। গত ৫-৬ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকান্ডের তদন্তে গণতদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। বায়তুল মোকাররম ও পল্টন এলাকার সহিংসতার তদন্ত ও বিচার করতে হবে। আন্দোলন ও আন্দোলন প্রতিরোধের নামে বিএনপি, জামায়াত-শিবির ও আওয়ামী লীগের সহিংসতার তদন্ত ও বিচার করতে হবে।

৬।​ক্রসফায়ারের নামে বিনাবিচারে রাষ্ট্রীয় হত্যা, গুম বন্ধ করতে হবে এবং এ ধরনের সকল হত্যার বিচার করতে গণতদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।

৭।​সকল ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে, ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস ও মনুষ্যোচিত মজুরী দিতে হবে। শ্রমিক স্বার্থবিরোধী প্রস্তাবিত শ্রম আইন ২০১৩ বাতিল করতে হবে। শিল্প পুলিশ ও শিল্প গোয়েন্দা বাতিল করতে হবে। রানা প্লাজাসহ ভবন ধসে ও আগুনে পুড়ে কয়েক হাজার শ্রমিক গণহত্যাকারী গার্মেন্ট মালিকদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ২৪ এপ্রিল গার্মেন্টস শ্রমিক গণহত্যা দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করতে হবে। শ্রমিক গণহত্যা স্মরণে সাভারে রানা প্লাজায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে হবে।

৮।​গ্রামাঞ্চলসহ রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী সাহায্য সংস্থার (এনজিও) চক্রান্ত ও অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।

৯।​শিক্ষাঙ্গনে সরকারদলীয় সন্ত্রাস ও প্রশাসনিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।

১০।​স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একাত্তরের সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে।

১১।​ ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগণের ঘরবাড়ি-উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগকারীদের গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে। ভূমি বেদখল ও বাস্তুুভিটা থেকে উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। মসজিদ মন্দির সহ সকল ধর্মীয় স্থান রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

১২।​তেল, গ্যাস ও কয়লা ক্ষেত্রে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী সকল উৎপাদনবণ্টন চুক্তি বাতিল করতে হবে। পরিবেশ ধংস করে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সুন্দরবন ধংস করে রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। ফুলবাড়ির চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে।

১৩।​দেশের নিরাপত্তা বিপন্নকারী হাসিনা-মনমোহন চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত সোফা, যৌথ অংশীদারী সংলাপ, যৌথ সামরিক মহড়া প্রভৃতি গোপন ও অসম চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ ও বাতিল করতে হবে।

১৪।​ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন, ভারতীয় রাষ্ট্রদূতসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রদূতদের রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

আগামী কর্মসূচি
১৬ জুন বিকেল ৪টায় ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সভা সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে বিক্ষোভ।
* ২০ জুন থেকে ২০ জুলাই দেশব্যাপী প্রচার জনসংযোগ।                      
 * আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় চার সংগঠনের জাতীয় প্রতিনিধি সভা।

ডা. ফয়জুল হাকিম
সম্পাদক, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
জাফর হোসেন

সভাপতি নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা
মাসুদ খান
আহ্বায়ক জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ
টিপু বিশ্বাস
সমন্বয়ক জাতীয় গণফ্রন্ট

অস্থায়ী কার্যালয় : ৩৩ তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা (৫ তলা), ঢাকা-১০০০।
০১৭১৩০৬৩৭৭৬, ০১৯১৫২২১৯৮০, ০১৭১২৬৭০১০৯, ০১৭১১৯৭০৫১২।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের আহবান

দেশ এখন এক রাজনৈতিক দুর্যোগপূর্ণ পথ অতিক্রম করছে -এমন কথা আজ সারা দেশ জুড়ে জনগণের সর্বস্তরে শোনা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে এটা এখন জনগণের সর্বপ্রধান জিজ্ঞাসা। দেশের অবস্থা সম্পর্কে এই উৎকণ্ঠা ও দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এই আশঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা কোন ফাঁকা ব্যাপার নয়। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এই পরিস্থিতির গর্ভেই এই উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কার জন্ম। বাংলাদেশে এখন সামাজিক শৃঙ্খলা ক্ষেত্রে যা কিছু বোঝায় তা এমনভাবে ভেঙে পড়ছে যাতে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ভাঙন জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে তার সমস্ত লক্ষণ সমাজে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক জীবনের শৃঙ্খলা পর্যন্ত ভেঙে পড়তে থাকা এরই এক দৃষ্টান্ত। কোন সমাজে এই অবস্থা সম্ভব হয় যখন দেশের শাসন ব্যবস্থা শুধু ভেঙে পড়তে থাকে তাই নয়, এই শাসন ব্যবস্থার আভ্যন্তরীণ সংকটই এই ভাঙনের প্রক্রিয়া সৃষ্টি করে ও ত্বরান্বিত করতে থাকে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যাবে এখানকার শাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বলতে বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। রাষ্ট্রের কোনো সংস্থাই এখন নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে না, এটা বললেও কম বলা হয়। কোন ক্ষেত্রেই, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, কর্ত্যবরত লোকরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে না। অবস্থা দেখে মনে হয় অল্প দিনের মধ্যেই এই সামান্য ব্যতিক্রমের দেখা আর পাওয়া যাবে না। এই অবস্থা সাধারণভাবে প্রশাসন, পুলিশসহ বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনী, আদালত, শাসক শ্রেণীর সকল রাজনৈতিক দল, ছাত্র যুব সংগঠন, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিরাজ করছে। এই সাথে আছে মেরুদণ্ডহীন লেখক সাহিত্যিক শিল্পী বুদ্ধিজীবীর দল, যাদের প্রায় সমগ্র অংশই ব্যক্তিস্বার্থ এবং মতলববাজি ছাড়া অন্য কিছুই বোঝে না। এদের সামাজিক দায়িত্ববোধ বলে কিছু নেই। একটি দেশে এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে বিরাজ করার অর্থ হলো, আভ্যন্তরীণভাবে সমাজের সব কিছুই ধসে পড়ার মতো (Collapse) অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীন ইতিহাসে এই অবস্থাকে বলা হতো মাৎস্যন্যায়। বর্তমানে এরই নাম চরম নৈরাজ্য বা অরাজকতা। প্রাচীনকালে কোন দেশের এই অবস্থা হলেই সে দেশ অন্য দেশের দ্বারা আক্রান্ত হতো। দেশে শাসক পরিবর্তন হতো। এখনো নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে এটাই ঘটে থাকে। কোন দেশ অন্য দেশের নিয়ন্ত্রণের অধীন হওয়ার এটাই পূর্ব শর্ত। ১৯৭২ সাল থেকেই গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ নয়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতির মূল স্তম্ভ হিসেবে কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম পর্বে রাষ্ট্রনীতির যে ভিত্তি কার্যক্ষেত্রে স্থাপিত হয়েছিল সেই ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থেকে বাংলাদেশে একের পর এক সরকার, নির্বাচিত অথবা অনির্বাচিত যাই হোক, শোষক শ্রেণীর স্বার্থে দমনপীড়ন, অপহরণ, গুম খুন চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ, র‍্যাব, আনসার, বিডিআর/বর্ডার গার্ড ইত্যাদি সশস্ত্র বাহিনী দিয়ে তারা নিজেদের হেফাজতে রেখে ও ক্রসফায়ারের নামে বিরোধী রাজনৈতিক লোকদেরকে হত্যা করছে। এখন হঠাৎ করে ক্রসফায়ার কিছুটা কমিয়ে এনে তারা অপহরণ, গুম খুন করছে। এই অপহরণ যে কী হারে হচ্ছে তার হিসাব শুধু চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী অথবা শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম এর দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যাবে না। ছাত্র, যুবক, নারী, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত চাকুরীজীবী, পেশাজীবী ইত্যাদি আজ ব্যাপকভাবে ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অপহৃত ও গুমখুন হচ্ছে। নিজেদের দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এরা কিভাবে হত্যাকাণ্ড করছে তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত টেলিভিশন সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ড। বাস্তবতঃ বাংলাদেশ এখন পরিণত হয়েছে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। শোষণ ব্যবস্থা রক্ষা ও চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই সন্ত্রাসী রাষ্ট্র সর্বস্তরের জনগণের বিরুদ্ধে, বিশেষতঃ শ্রমজীবী জনগণের ও তাদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে, এখন প্রায় এক সর্বাত্মক আভ্যন্তরীণ যুদ্ধ পরিচালনা করছে। গ্রেফতার, পুলিশ ও র‍্যাব এর রিমান্ড, ক্রসফায়ার, আটক অবস্থায় মৃত্যু, অপহরণ, গুম খুন ইত্যাদি এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের নিয়মিত কাজ। এ সবের বিরুদ্ধে জনগণের রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং আন্দোলন দমন করার উদ্দেশ্যে তারা সভা সমাবেশ, মিছিল, দেওয়াল লিখন ইত্যাদির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। পোস্টার ও লিফলেট নিষিদ্ধের সম্ভাবনার কথাও এখন সরকারী মহল থেকেই শোনা যাচ্ছে। সরকারী মালিকানাধীন কলকারখানায় সরকার শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে কাজ করতে দেয় না এবং দালালদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে। গার্মেন্ট কারখানাগুলিতে নিয়োগপত্র না দিয়ে এবং ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ রেখে পুরোপুরি ফ্যাসিস্ট কায়দায় শোষণ নির্যাতন চালাচ্ছে। এই শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামান্য প্রতিরোধও নিষ্ঠুরভাবে দমন করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার গড়ে তুলেছে শিল্প পুলিশ নামে এক বিশেষ সশস্ত্র বাহিনী। কৃষকরা আজ হাড়ভাঙা খাটুনীর পর ধানসহ কোন ফসলেরই উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না। বাজারে কৃষি পণ্যের দাম চড়া থাকলেও এই চড়া দামের ফায়দা কৃষকের ঘরে নয়, ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের ঘরেই যাচ্ছে। দেশে কৃষি সংস্কার ও ভূমি নীতির আমূল পরিবর্তন আজ জরুরী হয়েছে। এই পরিবর্তন ছাড়া কৃষকদের বিপন্ন ও দুর্দশাগ্রস্থ জীবনের পরিবর্তন সম্ভব নয়। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে অনেক কথাবার্তা ও সরকারের সমালোচনা হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য বিষয়ে কম লোকেরই ধারণা স্পষ্ট আছে। এটা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে সকাল-সন্ধ্যা যেভাবে আঘাত করতে থাকে, তাদের ঘুম এমনভাবে বি করে, এমন আর কোনো কিছুতেই ঘটে না। নিরাপত্তার প্রশ্ন শুধু খুন-খারাবী, অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যে নিরাপত্তার অভাব গরীব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষকে অবিরত অস্থির রাখে তা হলো, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি। এর মধ্যে যাতায়াত ব্যয়কেও গণ্য করতে হবে। নির্দিষ্ট আয়ের লোকদের মধ্যে শ্রমিকদের অবস্থান এক্ষেত্রে রীতিমত দুর্বিষহ। প্রকৃত মজুরী বৃদ্ধির কোনো ব্যবস্থা বছরের পর বছর পার হলেও তাদের ক্ষেত্রে নেই, অথচ মূল্য বৃদ্ধির মোকাবেলা তাদেরকে প্রতিদিন করতে হয়। প্রতিদিনই তাদের প্রকৃত মজুরী কমে। এর থেকে বড় নিরাপত্তাহীনতা আর কী আছে? তাঁদের অবস্থার এক শোচনীয় দিক হলো চিকিৎসার অভাব। অর্থ সামর্থ্য যাদের আছে তারা দেশে এ্যাপোলো, ইউনাইটেড, স্কয়ার ইত্যাদি হাসপাতালে এবং বিদেশে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকায় চিকিৎসা নিচ্ছে। কিন্তু গরীবের চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। গ্রামাঞ্চলে যে চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে সেটা জড়িবুটি, দোয়া-দরুদের ‘চিকিৎসার’ থেকে বেশী কিছু নয়। খাদ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিরাপত্তার এই অভাব সমাজের ভিত্তিভূমিকে আজ নাড়া দিচ্ছে। আমরা আগেই বলেছি যে, একটি দেশে আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যখন অরাজকতা দেখা দেয়, সমগ্র শাসন ব্যবস্থায় যখন অনতিক্রম্য ধস নামে, তখন সে দেশ বৈদেশিক আক্রমণের লীলাভূমিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে আজ তাই হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বলে বাস্তবতঃ এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় এখন সাম্রাজ্যবাদী মহলের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার স্ট্রাটেজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভারতকে সঙ্গে নিয়ে যে চক্রান্ত কার্যকর করছে সে চক্রান্তের কারাগারে বাংলাদেশের জনগণ এখন বন্দী হয়েছেন। ২০১১ সালের গোড়ার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লী গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংএর সাথে এক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেন। সেই চুক্তির সামান্য অংশই সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। এ ছাড়া চুক্তিটিতে কি ছিল জনগণের তা জানা নেই। কিন্তু সেই চুক্তি পরবর্তী সময়ে ট্রানজিট, পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্ক, টিপাইমুখ বাঁধ, তিস্তা নদীর পানির হিস্যা, সীমান্তে হত্যা ইত্যাদি নিয়ে ভারত সরকার যা করছে তার থেকে প্রকাশিত হয় যে, সেই চুক্তিতে অধীনতাজনক অনেক কিছুই ছিল যা গোপন রাখা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ বাংলাদেশে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি গড়ার জন্য সরকারের সাথে ষড়যন্ত্র করছে। ইতিমধ্যেই তারা নানা বিভ্রান্তিকর নামে বাংলাদেশের সাথে কতকগুলি সামরিক চুক্তি সম্পাদন করে নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। ভারত ট্রানজিট ইত্যাদির মাধ্যমে যে সব সুবিধা আদায় করার চেষ্টায় নিযুক্ত আছে ও বাস্তবতঃ যে সব সুবিধা তারা চুক্তি ছাড়াই অর্জন করছে তাতে বাংলাদেশ বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আরো ক্ষতির দিকে এগিয়ে চলেছে। দেশপ্রেম, জনস্বার্থ ইত্যাদির বুলি সরকারের মুখে অহরহ শোনা গেলেও সরকারি লোকজন তাদের দলীয়, পারিবারিক ও ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য দেশের স্বার্থ বিক্রি করছে। বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল যে রায় দিয়েছে সেটা নিয়ে সরকার ও তার প্রধানমন্ত্রী ও সেই সঙ্গে তাদের দ্বারা প্রতিপালিত বুদ্ধিজীবীরা যে ন্যাক্কারজনক প্রচার কাজ করছে এর মত কেলেঙ্কারী অন্য কোনো দেশে আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ এভাবে অনেক হয়ে থাকে। তাতে জয়-পরাজয়ের কোনো ব্যাপারই থাকে না। তা নিয়ে কোন দেশই ঘটা করে উৎসবের চিন্তা করে না। কিন্তু বাংলাদেশে সেটাই দেখা গেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার মধ্যে। এই নির্লজ্জ আত্মপ্রচার প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের সরকার ও সামগ্রিকভাবে শাসক শ্রেণী জনগণকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে কত হীন কার্যকলাপে নিযুক্ত হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে ট্রাইব্যুনালের রায়ের মাধ্যমে মায়ানমার বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের থেকে বেশি এলাকা পেয়েছে। কাজেই তারা এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই পরাজিত হয়নি। কিন্তু এ নিয়ে তারা কোন বিজয় উৎসব করেনি। এতো গেল পরিস্থিতির একটি দিক। এর অন্য দিক হলো বাংলাদেশ যতখানি এলাকা আইনগতভাবে নিজের অধিকারে পেয়েছে তাতে বাংলাদেশের নয়, প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ বিশেষতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই প্রকৃত লাভ হয়েছে। সরকার তাল্লো এবং কনোকো ফিলিপসকে সমুদ্রে গ্যাস ক্ষেত্র ইজারা দিলেও দুদেশের সীমানা আইনগতভাবে চিহ্নিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের পক্ষে কাজ শুরু করা সম্ভব ছিল না। এখন তারা অবাধে নিজেদের কাজ করবে। দেশের স্থলভাগে বাংলাদেশ যেমন সাম্রাজ্যবাদীদেরকে গ্যাস ক্ষেত্র ইজারা দিয়ে তাদের লাভ ও দেশের ক্ষতির ব্যবস্থা করেছে, তেমনি সমুদ্রের গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা হয়েছে। কাজেই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণে যদি কারো প্রকৃত জয় হয়ে থাকে সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশের। ভবিষ্যতে এরাই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের তেল-গ্যাস সম্পদ বড়ো আকারে লুটপাট করবে। শুধু আওয়ামী লীগই নয়, শাসক শ্রেণীর যে কোন দলই ক্ষমতায় আসুক, এটাই ঘটতে থাকবে। কারণ বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী আজ পুরোপুরি সাম্রাজ্যবাদের অধীন। বাংলাদেশ এখন এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে যা দেশের সংবিধান অনুযায়ী ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না। বলা চলে, বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই সংবিধানকে পদদলিত করে চরম স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে তারা এই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। শাসক শ্রেণীর নিজেরই যখন এই অবস্থা তখন এই সংবিধান যে জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য সম্পূর্ণ অকার্যকর, এ নিয়ে কোন বিতর্ক অর্থহীন। তাই জনগণের আজ প্রয়োজন এক নতুন সংবিধান। এই সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে বাংলাদেশে এখন যে নির্বাচন ব্যবস্থা আছে, যে শর্তের অধীনে এখন নির্বাচন হচ্ছে তা বর্জন ও বাতিল করতে হবে। এর জন্য দেশব্যাপী এক রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান শাসন ব্যবস্থা ফেলে দিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সংবিধান সভা গঠন করতে হবে। শাসক শ্রেণীর শৃংখল থেকে মুক্ত হওয়ার এটিই একমাত্র পথ। বাংলাদেশে সংসদীয় বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি এখনও পর্যন্ত কোনমতে তাদের শারীরিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, তারা শাসকশ্রেণীরই অংশ। কাজেই শাসক শ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল মুক্ত হওয়ার সংগ্রামে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। উপরন্তু তারা আজ সর্বতোভাবে শাসকশ্রেণীর গুপ্তচর হিসেবেই কাজ করছে। এই অথর্ব ও নিবীর্য বামপন্থী দলগুলির দিকে না তাকিয়ে, জনগণকে নতুনভাবে সংগঠিত হতে হবে। লেনিন বলেছিলেন, সংগঠন ছাড়া গরীবের আর কিছুই নেই। কাজেই সংগঠন গড়ে তুলে, তার মাধ্যমেই আজ বাংলাদেশের জনগণকে, এদেশের তরুণ ও যুবকদের এগিয়ে আসতে হবে। সমাজে পরিবর্তনের আকাংখা জোরদার হয় যখন মানুষ পরিবর্তন সম্ভব মনে করে। মানুষের নিজেদের বঞ্চনা এবং শোষক শাসক শ্রেণীর বেপরোয়া ভোগ বিলাসের তুলনা তাদের চেতনাকে প্রখর করে। এই প্রখর চেতনাই তাদের মধ্যে সংগঠিত হওয়া ও সংগ্রাম করার তাগিদ সৃষ্টি করে। বর্তমানে জনগণের মধ্যে এই তাগিদ ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে। এই তাগিদকে সক্রিয় করা ও সংগঠিত রূপ দেওয়া, এই তাগিদকে ঘরোয়া সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বা নিষ্ফল কিছু কার্যকলাপের মরুভূমিতে হারিয়ে যেতে না দিয়ে তাকে সংগ্রামে পরিণত করাই প্রগতিশীল, বিপ্লবী ও সমাজতান্ত্রিক শক্তির কর্তব্য। এই বিপ্লবী শক্তিকে আজ শুধু জনগণের দেশীয় শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিযুক্ত হলেই চলবে না। আমাদের দেশকে আজ মার্কিন, ইউরোপীয়, ভারতীয়, সৌদি ইত্যাদি বিদেশী রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী এবং আধিপত্যবাদী প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করার জন্যও সংগ্রাম করতে হবে। কারণ বাংলাদেশে আজ দেশীয় পুঁজি, ভূমি মালিক এবং অন্য শত্রুদের এক অখণ্ড শোষণ নির্যাতন জারী আছে। দেশীয় শ্রেণী শত্রু ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম আজ অপরিহার্য হয়েছে। তাই দেশ ও জনগণের শত্রুদেরকে পরাজিত করার পবিত্র কর্তব্য সম্পাদনের জন্য আমরা বদ্ধপরিকর। এই গণসংগ্রামে দেশের সকল প্রগতিশীল, বিপ্লবী ও সমাজতান্ত্রিক শক্তিকে এগিয়ে আসার জন্য, বাংলাদেশে একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। ১১.৫.২০১২

কমরেড বদরুদ্দীন উমরকে ৮০ তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা

আগামী ২০ ডিসেম্বর জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি কমরেড বদরুদ্দীন উমরের ৮০ তম জন্মদিন। তাকে শুভেচ্ছা ও বিপ্লবী অভিনন্দন।

বদরুদ্দীন উমর : সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

১৯৩১   :         জন্ম ২০ ডিসেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহর। পিতা- আবুল হাশিম, অখণ্ড ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক; মাতা- মেহেরবানু বেগম।

১৯৪১    :         স্কুলে ভর্তি।

১৯৪৫   :         প্রথম তৎকালীন পূর্ববাংলায় বেড়াতে আসা ও এ অঞ্চলের গ্রাম-নদী-নালার সঙ্গে পরিচয়। ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও-এ মুসলিম লীগের নির্বাচনী সভায় যোগদান, ‘মিল্লাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম রচনা ‘বিদেশীরা প্রভুত্ব করিবে কেন?’

১৯৪৬   :         ১৬ আগস্ট কলকাতার ময়দানে পিতার সঙ্গে মুসলিম লীগের বিশাল জনসভায় যোগদান। এই কলকাতায় অভাবিতপূর্ব রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা শুরু। সাধারণ নির্বাচন এবং মুসলিম লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ। দিল্লীতে এ উপলক্ষে ৭ থেকে ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পিতার সঙ্গে যোগদান।

১৯৪৭   :         ফেব্র“য়ারি মাসে ডাকঘর নাটকে অমলের ভূমিকায় অভিনয়। পিতার সঙ্গে কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসুর বাসায় গোপন বৈঠকে অংশগ্রহণ।

১৯৪৮   :         বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস। বর্ধমান রাজ কলেজে আইএসসিতে ভর্তি।

১৯৫১   :         ১২ এপ্রিল দেশত্যাগ করে ঢাকায় আগমন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে আইএসসি পাস।

১৯৫২   :         ফেব্র“য়ারি মাসে রচনা করেন ‘আমাদের ভাষার লড়াই’ নামক পুস্তিকা। এটি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক দশ হাজার কপি ছাপা হয়। আন্দোলনের সময় এটি মাইকে পড়া হতো। ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা ও ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে পুরো সময় সক্রিয় অংশগ্রহণ।

১৯৫৩   :         ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে দর্শনে অনার্স।

১৯৫৪   :         ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি বিভাগে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকতা।

১৯৫৫   :         ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে Institute of Human Relation -এ গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগদান। প্রথম শ্রেণীতে দর্শনে এমএ।

১৯৫৬   :         ১ নভেম্বর দর্শনের লেকচারার হিসেবে চট্টগ্রাম কলেজে যোগদান।

১৯৫৭   :         ১ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে যোগদান।

১৯৫৮   :         বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে কলকাতা, বেনারস, লক্ষেèৗ, আগ্রা, দিল্লী, লাহোর, পেশোয়ার শিক্ষা সফর।

১৯৫৯   :         চাচাত বোন সুরাইয়া হানম-এর সঙ্গে বিবাহ ৭ জুন। পাকিস্তান গভর্নমেন্টের স্কলারশিপ নিয়ে অক্সফোর্ডে পড়াশোনা। বিষয় দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি। ইংরেজিতে চচঊ। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে অক্সফোর্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা ২৮ সেপ্টেম্বর।

১৯৬০   :         ইউরোপ ভ্রমণ। প্রথম সন্তান মসিহা আখতার বানু ফালুদা’র জন্ম।

১৯৬১   :         অক্সফোর্ডের কুইন্স কলেজ থেকে দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতিতে ডিগ্রী লাভ। ৬ আগস্ট অক্সফোর্ড থেকে দেশে ফেরা। সেপ্টেম্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজে যোগদান।

১৯৬২   :         ২২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সন্তান সোহেলের জন্ম।

১৯৬৩   :         রাজশাহী বিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠা।

১৯৬৪   :         রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠা। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সোশ্যাল ওয়ার্ক কলেজেরও প্রতিষ্ঠাতা।

১৬ ডিসেম্বর দ্বিতীয় কন্যা সারাহ আখতার বানুর জন্ম।

পূর্ব মেঘ পত্রিকায় ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশের ফলে ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি।

১৯৬৫   :         লাহোরে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান।

১৯৬৬   :         সাম্প্রদায়িকতা গ্রন্থ প্রকাশিত হলে সাংস্কৃতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। শাসকশ্রেণী পাকিস্তান বিরোধিতার জন্যে বদরুদ্দীন উমরের উপর ক্ষিপ্ত হয়।

বাংলা একাডেমীতে ২০ মে অনুষ্ঠিত আহমেদুর রহমান স্মরণসভায় ‘বাঙালী সংস্কৃতির সঙ্কট’ প্রবন্ধ পাঠ। এটাই ছিল তাঁর ঢাকায় প্রথম বক্তৃতা।

১৯৬৭   :         খাজা শাহাবুদ্দীন ও পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রবিরোধী কর্ম তৎপরতার বিরুদ্ধে স্বাক্ষর। ভাষা আন্দোলন বিজয়ের বই লেখার পরিকল্পনা।

ঢাকায় ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী সভায় ‘America’s freedom fights in Vietnam’ প্রবন্ধ পাঠ।

১৯৬৮   :         অক্টোবরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত গোর্কির জন্মশতবার্ষিকী সভায় বক্তৃতা।

লেখালেখির কারণে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের ক্রমাগত চাপ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর শামসুল হক বিরক্ত হয়ে বদরুদ্দীন উমরকে কিছুদিন লেখালেখি বন্ধ করার অনুরোধ করেন। ফলে অক্টোবর মাসে ভিসির হাতে অধ্যাপনায় ইস্তফাপত্র প্রদান।

৩১ ডিসেম্বর অধ্যাপনার মেয়াদ শেষ করে ঢাকায় আগমন।

১৯৬৯   :         পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-তে এপ্রিল মাসে যোগদান। প্রাথমিক অবস্থায় রাজশাহীতে পার্টির শাখা গঠনের চেষ্টা।

ভাষা আন্দোলন বিষয়ক ইতিহাস লেখার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, শেখ নজরুল ইসলাম প্রমুখ নেতার সাক্ষাৎকার গ্রহণ।

১৯৭০   :         ৮ই ফেব্র“য়ারি পার্টির পত্রিকা গণশক্তি প্রকাশ ও সম্পাদনা।

১৯৭১    :         মার্চের শেষ দিকে পার্টির দুজন বিশিষ্ট কর্মীর সঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করে গ্রামে গিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলার চেষ্টা। এ প্রতিজ্ঞা অনুসারে মুক্তি সংগ্রামের উদ্দেশ্যে অ্যামুনিশন, থ্রি নট থ্রি, চাইনিজ রাইফেল ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে ঢাকা ত্যাগ। এ সময় বিশেষ করে দক্ষিণ বাংলার গ্রাম-গঞ্জ পায়ে হেঁটে, কিছু পথ নৌকায় করে, প্রতি মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনসাধারণকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করার প্রয়াস চালান।

ডিসেম্বর মাসে পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) থেকে পদত্যাগ।

১৯৭৩   :         বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রত্যাখ্যান।

১৯৭৪   :         সংস্কৃতি পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা। কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ।

১৯৭৮   :         বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের প্রথম সম্মেলনে যোপদান।

১৯৭৯   :         বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের প্রথম সম্মেলনে যোপদান।

১৯৮১   :         বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ। বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ।

১৯৮৪   :         কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজা রাম মোহন রায় স্মারক বক্তৃতা প্রদান।

১৯৮৭   :         গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট গঠনে নেতৃত্ব প্রদান।

অক্সফোর্ডে কুইন এলিজাবেথ হাউসে বক্তৃতা। ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা। বিখ্যাত মার্কসীয় অর্থনীতিবিদ আর্নেস্ট ম্যান্ডেলের সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা।

১৯৮৮   :         হাইডেলবার্গ ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা। আর্নেস্ট ম্যান্ডেলের সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা।

১৯৮৯   :         কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগে বক্তৃতা।

১৯৯০   :         আলবেনিয়া সফর।

১৯৯২   :         একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠনে ভূমিকা পালন।

১৯৯৪   :         যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ফোবানা সম্মেলনে যোগদান। লন্ডন স্কুল অব অরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ-এ বক্তৃতা। ব্রাসেলসে আর্নেস্ট ম্যান্ডেলের সাথে ৩য় বার সাক্ষাৎ ও আলোচনা।

১৯৯৫   :         নিউ ইয়র্কে বেঙ্গল কনফারেন্সে যোগদান।

অন্ধ্রপ্রদেশের হায়দ্রাবাদে সিপিআই (এম-এল) জনশক্তি আহুত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান।

১৯৯৮   :         দিল্লীতে অমিয়া এন্ড বি জি রাও স্মারক বক্তৃতা প্রদান।

২০০১   :         বিহারের পাটনায় সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন-এর কংগ্রেসে যোগদান।

২০০২   :         পশ্চিমবঙ্গের পানিহাটিতে বেগম রোকেয়ার সমাধিস্থান চিহ্নিতকরণ উপলক্ষে বক্তৃতা প্রদান ও ফলক উন্মোচন।

২০০৩   :         জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল গঠন, সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ।

২০০৪   :         মুম্বাইতে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সম্মেলন ‘মুম্বাই রেজিসটেন্স ২০০৪’ উদ্বোধন।

২০০৫   :         অন্ধ্রপ্রদেশের রাজামুন্দ্রীতে সিপিআই (এম-এল) জনশক্তি আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান।

২০০৯   :         ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ।

২০১১    :         জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠনে নেতৃত্ব দান।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালসহ সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালের বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারিকরণ রুখে দাঁড়ান

সংগ্রামী দেশবাসী,

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) গত ১লা অক্টোবর থেকে বিকেল ৩টা হতে ৫টা পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ২০০ টাকা ফি নিয়ে রোগী দেখা শুরু করেছেন। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারিকরণের সরকারি চক্রান্ত পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সরকার গত বছর দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে কতগুলো আইটেমের উপর ইউজার ফি নির্ধারণ করেছে। এর মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যে সব অধিকার ছিল তা কেড়ে নেয়া হয়েছে। আর তা করা হয়েছে স্বাস্থ্যসেবার মান ‘উন্নয়নের’ নামে। এর ফলে শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী জনগণ বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হলো। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার ‘অর্থের বিনিময়ে সরকারি চিকিৎসা’র এই নীতি বাস্তবায়ন করে প্রমাণ করেছে তারা পুঁজিপতি-ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষাকারী ও গণবিরোধী। ১৯৮০-র দশকে সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সরকার সরকারি হাসপাতালে অর্থের বিনিময়ে টিকেট কেটে রোগী দেখার সূচনা করেছিল। পরবর্তীতে সমগ্র রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সেবা খাতকে বেসরকারিকরণের ও বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে এরশাদ সরকার এক স্বাস্থ্যনীতি তৈরি করে। দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এর আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে এই গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল করতে সরকার বাধ্য হয়। এর কিছুদিন পরেই এক গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এর পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সকল সংসদীয় বেসামরিক সরকারই সামরিক শাসক এরশাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্রমশঃ জনগণের বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকারকে সঙ্কুচিত করে এসেছে।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-উপদেষ্টা এবং সরকারি আমলা, জজ সাহেব, সামরিক বাহিনীর অফিসাররা সরকারি অর্থে দেশে ও বিদেশে চিকিৎসা করে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন। এই ব্যয় জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে করা হচ্ছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তারা আরাম-আয়েশ-বিলাস-বিদেশ ভ্রমণ করেন। এছাড়া সামরিক খাতসহ বিভিন্ন অনুৎপাদক খাতে প্রতি বছর জনগণের ট্যাক্সের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। অথচ জনগণের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া হয় না। স্বাস্থ্যখাতে মাথা পিছু সরকারি ব্যয় বরাদ্দ বছরে মাত্র ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা অথচ ন্যূনতম চিকিৎসার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ মতে এটা হওয়া উচিত ২,৩৮০ টাকা (২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী)। বর্তমানে দেশে সরকারি হাসপাতালে মাত্র ৩৫ হাজার বেড রয়েছে যেখানে প্রয়োজন ৫ লাখ বেড। এক হিসেবে গড়ে ২৫ লাখ মানুষের জন্য রয়েছেন মাত্র একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার । এ রকম পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত চিকিৎসার নামে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা ফি নিয়ে রোগী দেখা শুরু করেছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার প্রথম সরকার আইপিজিএমআর-কে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে রূপান্তরিত করে টিকিটের মাধ্যমে রোগী দেখার কর্মসূচি চালু করে এবং পুরাতন রেফার্ড সিস্টেম বাতিল করে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালকে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নিয়েই এই হাসপাতালে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের নিকট থেকে অর্থ আদায় প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এরপর একে একে সকল সরকারি হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালেও একইভাবে রোগীর নিকট থেকে অর্থ আদায় শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ডাঃ প্রাণগোপাল দত্ত ‘কম খরচে সেবা দেওয়া’র কথা বলে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে বাণিজ্যিকীকরণ ও পর্যায়ক্রমে বেসরকারিকরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছেন। এ প্রাণঘাতি পরিকল্পনা হাসিনা সরকারের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতিরই অংশ। সরকার বিশ্ব ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত সকল সেবা খাত থেকে একে একে বরাদ্দ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চক্রান্ত করছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই চক্রান্তের একটি উদ্দেশ্য হলো মুনাফালোভী প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ ফি আদায়কে ন্যায্যতা দেয়া, তাদের মুনাফার বৃদ্ধি ঘটানো; অন্য উদ্দেশ্য হলো ‘কম খরচে বিশেষায়িত চিকিৎসা’ চালুর মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসকের পরামর্শ সেবা পাওয়ার অধিকারকে উচ্ছেদ করা। সরকারি নীতি অনুসারেই বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রভৃতি বৃদ্ধি করে দেশে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের বিপুল ঘাটতি পূরণ করার কাজে মনোযোগ না দিয়ে এই বিশেষায়িত হাসপাতালকে মুনাফালোভী করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে ক্রমশঃ ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস চালু করে হাসপাতালগুলোকে ক্রমান্বয়ে বেসরকারিকরণ করা হবে।

বন্ধুগণ,

আমাদের দাবি,

* অবিলম্বে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে বৈকালিক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ সেবা বিনামূল্যে করতে হবে; কোনো প্রকার ফি নেয়া চলবে না। সরকারি হাসপাতালে ইউজার ফি নেয়া বন্ধ করতে হবে। শ্রমিক কৃষকসহ সকলকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

* গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা বিস্তারে প্রতিটি উপজেলায় ২০০ বেডের হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারসহ পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ, চিকিৎসার আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

* বিশেষায়িত হাসপাতালে  ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে তাদের নন-প্র্যাকটিস ভাতা দিতে হবে। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

*প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবার মান ও দাম নিয়ন্ত্রণে এবং কমিশন ব্যবসা, দুর্নীতি ও রোগীদের হয়রানি বন্ধে আইন প্রণয়ন করতে হবে। চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

*ঔষধের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। জনগণের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

*সরকারি হাসপাতালকে বেসরকারিকরণের নীতি বাতিল করতে হবে। এনজিওদের হাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তুলে দেয়ার সকল প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বিশ্ব ব্যাংকের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

*গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল করতে হবে। সামরিক খাতসহ অনুৎপাদক খাতে বরাদ্দ হ্রাস করে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।

*সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা জনগণের অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

সংগ্রামী বন্ধুগণ,

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর অতিক্রান্ত হলেও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই জনগণকেই করতে হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সরকারি সিদ্ধান্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রুখে দাঁড়িয়েছে। সারা দুনিয়া জুড়ে, দেশে দেশে জনগণ নিজ অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমেছেন। গ্রীস, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড প্রভৃতি পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে যেমন, তেমনি তিউনিশিয়ায়, মিশরসহ আরব বিশ্বে রাজপথে জনগণ নিজ দাবি আদায়ে লড়ছেন। খোদ সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাখ লাখ মানুষ রাজপথে শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান কর্মসংস্থানের দাবিতে শহরের পরে শহরে সরকারি অফিস ও পুঁজিপতিদের কেন্দ্র ঘেরাও করে চলেছেন। আসুন, বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত-বঞ্চিত-অপমানিত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হই। আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে সরকার গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হবে। শোষক-শাসক শ্রেণী ও শোষণমূলক দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে জনগণের হাতে ক্ষমতা আনা, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের সরকার, শাসন ব্যবস্থা ও সংবিধান প্রতিষ্ঠা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনের সংগ্রাম বেগবান করতে, আসুন, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাসেবা খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারিকরণের ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়াই।

বদরুদ্দীন উমরের লেখা পড়ুন নিচের লিংকেঃ

বদরুদ্দীন উমরের লেখাঃ

http://umarjmc.wordpress.com

পুজিবাদের স্বার্থ রক্ষায় ৫ বাম দলের কর্মসূচী – হাসিবুর রহমান

[এখানে ৫ বাম দল নামক যে রাজনৈতিক জোটটির কর্মসূচি পর্যালোচনা করা হয়েছে সেই জোটটি আর নেই, আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে মিলে তারা গঠন করেছে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। তবে বাস্তব রাজনৈতিক কর্মকান্ডের দিক থেকে ৫ বাম দল ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। বলা চলে, এ হলো নতুন বোতলে পুরনো মদ। পর্যালোচনাটি ২০০৬ সালে তৈরী করা হলেও এর প্রয়োজন তাই ফুরিয়ে যায় নি। কিছুটা পরিমার্জন করে হাজির করা হলো।]

৩ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে একটি সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ৫ বাম দল তাদের ৭ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।

জাতীয় গণফ্রন্ট, বিপ্লবী ঐক্য ফ্রন্ট, গণসংহতি আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি এই চারটি দল মিলে ২০০২ সালে ৪ বাম দল নামে একটি জোট গঠন করে। অন্তর্ভুক্ত দলগুলির সংখ্যা গুণে রাজনৈতিক জোটের নামকরণ অবশ্য নতুন নয়। আশীর দশকে বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ও ৭ দল এই দুটি জোটে বামপন্থীদের প্রধান প্রধান সবকটি দলই অন্তর্ভুক্ত ছিল। সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাসদ (খালেকুজ্জামান), বাসদ (মাহবুব), শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল এরা ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দলে। ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ (এখনকার জাতীয় গণফ্রন্টের পূর্বসূরী) ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলে। ১৯৮৬-র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৫ দল ভেঙে গিয়ে জাসদ, দুই বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও  শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল ৫ দল নামে বামপন্থীদের ‘নিজস্ব’ রাজনৈতিক জোট গঠন করে। ৫ দল বামপন্থীদের জোট হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করে। ৯০ দশকের শেষার্ধে বামগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এর উদ্যোগে গণফোরাম, গণতন্ত্রী পার্টি ইত্যাদি মিলে গঠন করা হয় ১১ দল। আর ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ এই ১১ দলকে হজম করে নিয়ে গঠন করে ১৪ দলীয় জোট। সুতরাং দল গুণে জোটের নামকরণের এই অদ্ভূত কায়দাটা এদেশে বুর্জোয়াদেরই আবিষ্কার। এতে করে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের সাথে ‘কমিউনিস্ট’ ‘সমাজতন্ত্রী’ বা ‘শ্রমিক’ পার্টিসমূহের ঐক্যে মস্ত সুবিধাই হয়।

৪ বাম দলের সাথে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মাহবুব) যোগ দিলে জোটটির নতুন নামকরণ করা হয় ৫ বাম দল। জোটের নামকরণের ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের অনুকরণ ছাড়াও অতীতের ৫ দলের সক্রিয়তার যে স্মৃতিটুকু রাজনৈতিক কর্মী মহল ও মিডিয়ায় অবশিষ্ট রয়েছে তা অবলম্বন করে সেই স্থানটি অধিকার করে নেবার প্রচ্ছন্ন প্রয়াস যে এতে ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।

৫ বাম দল হচ্ছে এমন কতকগুলি সংগঠনের একটি জোট যাদের অধিকাংশেরই কোন ঘোষিত কর্মসূচি নেই। জোট গঠনের প্রায় ৪ বছর পর এর কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে। কর্মসূচিবিহীন সংগঠনগুলি এবার একটি কর্মসূচি পেল। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হলো জোট নিজেই পার্টির মতো আচরণ করতে চাইবে। জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদ হয়ে উঠতে চাইবে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি। এখন হয় জোটভুক্ত সংগঠনগুলি এর বিরোধিতা করুক সেক্ষেত্রে ৫ বাম দল হবে একটি নিষ্ক্রীয় জোট, নয়তো সবাই এর অধীনতা স্বীকার করুক সেক্ষেত্রে ৫ বাম দল ক্রমেই একক পার্টির মতো বিকশিত হবে।

‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার আশু রূপরেখা’ শিরোনামের ৫ বাম দলের কর্মসূচির শুরুতে রয়েছে ১৩টি প্যারাগ্রাফের একটি মুখবন্ধ, এর পর রয়েছে ৭ দফা কর্মসূচি। পর্যালোচনাকালে পাঠকদের সুবিধার্থে উদ্ধৃত প্যারাগ্রাফগুলোকে প্যারা চিহ্ন (§) ও সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবের পথ পরিস্কার করা।

১.বিপ্লব নয়, নির্বাচনের সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরীই লক্ষ্য

কর্মসূচির মুখবন্ধে ৫ বাম দল এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, বর্তমানে নির্বাচন যে শর্তের অধীন হয়েছে তাতে এর দ্বারা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন সম্ভব নয়। ১৩টি প্যারার মুখবন্ধের দ্বাদশ প্যারায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছার পর তারা কী ঠিক করলেন? তারা ঠিক করলেন ‘শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি শ্রেণী, দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী’ মিলে এমনভাবে আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে যাতে করে ‘সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরিবেশ’ তৈরী হয়। অর্থাৎ ৫ বাম দলের মূল লক্ষ্য মোটেই রাষ্ট্র ও সমাজে কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন নয়, শাসক-শোষক শ্রেণীকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী শ্রেণী সমূহের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে আসা নয়, তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচনের একটি সুুবিধাজনক পরিবেশ তৈরী করা। এই পরিবেশ তৈরী করার জন্য ‘শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি শ্রেণী’-কে হাত মেলাতে হবে ‘দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী’-অর্থাৎ বুর্জোয়াদেরই সাথে। ৫ বাম দলের মিত্র ‘দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী’ নিয়ে আমরা খানিক পরেই আলোচনা করবো। আপাততঃ দেখা যাক তাদের কর্মসূচিতে নির্বাচনের সুুবিধাজনক পরিবেশ তৈরীর এই লাইন কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

আগেই বলা হয়েছে কর্মসূচির মুখবন্ধে মোট ১৩ টি প্যারা আছে। এর মধ্যে §৩ থেকে §৮ ও §১০ এই ৭টি প্যারা, অর্থাৎ মুখবন্ধের অর্ধেকের বেশী ব্যয় করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সরকার বিরোধী আন্দোলন ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের ২৩ দফা কর্মসূচির সমালোচনায়।

মূল সমালোচনাগুলো হলো:

§৩. ‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে এই দাবির কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নাই।’ তাদের রাজনীতি বা কর্মসূচি ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ধারণ করে না’।

§৪. আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ঘোষিত ২৩-দফায় ‘দেশের সম্পদ ও উৎপাদন ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের আওয়াজ তোলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিভাবে এই স্বার্থ সংরক্ষিত হবে তার ন্যূনতম কোনো রূপরেখা নাই’।

§৫. ‘বোমা হামলা ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে হৈ হল্লাও বাগাড়ম্বরের বেশি কিছু হতে পারে নি।’

§৬. আওয়ামী লীগের ‘সংবিধান সমুন্নত’ রাখার ঘোষণা ‘ফাঁকা আওয়াজ’। কেননা বিদ্যমান সংবিধান ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থ উপযোগী’ নয়।

§৭. ‘কারচুপিহীন নির্বাচন হলেই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হবে, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যাবে’ আওয়ামী লীগের এই দাবি ‘অচল’।

§৮. ‘শাসক শ্রেণীর দলগুলির গোষ্ঠিগত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কুৎসিত প্রতিযোগিতা’ তাদের ‘শাসন ব্যবস্থা ও শ্রেণীস্বার্থকেও হুমকীর সম্মুখীন করে তোলে’। ‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচনী সংস্কারের প্রস্তাবে এই ব্যবস্থা থেকে উত্তরণের কোন উপাদান নাই।’

§১০. সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী নির্বাচন হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেও ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার ন্যূনতম কোন সম্ভাবনা নাই’। কেননা ‘আওয়ামী লীগের মধ্যে যে গোষ্ঠিটি চালিকা শক্তি তারা বিএনপি জোটের মতই সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত মার্কিন-ভারত অক্ষশক্তির পরিপূর্ণ তাবেদার’।

দেখাই যাচ্ছে যে, বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। সামান্য এদিক ওদিক করে এটিকে ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, বাসদ ইত্যাদি যে কোন দলের নামেই চালিয়ে দেয়া যায়। নিজেদের রণনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণার সময় আওয়ামী লীগের এই সমালোচনার প্রয়োজন হলো কেন ৫ বাম দলের? স্পষ্টতই ৫ বাম দল আওয়ামী লীগকে শ্রেণীগত শত্র“ হিসেবে দেখে না, দেখে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। আর তাই আওয়ামী লীগের ২৩ দফা কর্মসূচির বিপরীতে ৫ বাম দলের ৭ দফা কর্মসূচির ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্যই মুখবন্ধে আওয়ামী লীগ ও ২৩ দফার সমালোচনা করা হয়েছে।

এভাবে তৈরী মুখবন্ধের পর যে কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে তার প্রথম দফাতেই ৫ বাম দল ঘোষণা করেছে: “একটি সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বাস্তব পরিস্থিতি ও পরিবেশ তৈরীর জন্য” জনগণের বিপ্লবী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে “সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগী লুটেরা শাসকশ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী বিদ্যমান রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইন, লুটেরা মাফিয়া সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর সকল ক্ষমতা অপসারণ”, “অস্থায়ী বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা” এবং “তার নেতৃত্বে সংবিধান সভার নির্বাচন”।

‘সত্যিকার গণতান্ত্রিক’ নির্বাচন! সত্যিই!

এই নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টিতে তারা এতটাই সিরিয়াস যে “ন্যূনতম খরচে নির্বাচন অনুষ্ঠানের” কর্মসূচিও একই সাথে ঘোষিত হয়েছে।

নির্বাচনে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রশ্নটি বর্তমান মুহূর্তে শুধু তাদের কাছেই প্রাসঙ্গিক যারা বুর্জোয়াদের নির্বাচনী ব্যয়ের সাথে পাল্লা দিতে অক্ষম এবং অন্য কিছুর কথা বাদ দিলেও শুধু এই একটি কারণেই বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা যাদের প্রায় শূন্য। অর্থাৎ নির্বাচনী ব্যয়ের প্রশ্নটি শুধু মাত্র বুর্জোয়া নির্বাচনী ব্যবস্থাতেই প্রাসঙ্গিক, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে একটি বিপ্লবের পর নির্বাচনী ব্যয়ের প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক ও অবান্তর হয়ে পড়ে। যেহেতু ৫ বাম দলের লক্ষ্য নির্বাচনের সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরী, বিপ্লব নয়, তাই সস্তায় নির্বাচনের কর্মসূচি ঘোষণার সময় ৫ বাম দল ধরেই নিয়েছে যে ‘লুটেরা মাফিয়া সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর সকল ক্ষমতা অপসারণ’ করা হলেও টাকার থলেটা তাদের হাতে রয়ে যাবে। আর ‘অস্থায়ী বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সরকারের’ অধীনে নির্বাচনেও টাকাওয়ালাদের সাথেই তাদের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

৫ বাম দলের ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার আশু রূপরেখা’-র শিরোনামটি পাল্টে ‘সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরীর আশু রূপরেখা’ দিলেই যথার্থ হতো।

২. ৫ বাম দল যেভাবে বুর্জোয়াদের সহযোগী

মুখবন্ধের ১১ নং প্যারার গোটাটাই আমরা তুলে দিচ্ছি।

§ ১১. “সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার উপযোগী শ্রেণীশক্তি কারা? কিভাবে তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে? আমরা পরিষ্কার বলে এসেছি সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিশেষত মার্কিন-ভারত অক্ষশক্তি ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের বিরোধিতার প্রশ্নটিই হচ্ছে এই শ্রেণীশক্তি চিহ্নিত করার প্রধান মানদন্ড। শাসক শ্রেণীর ‘জাতীয়তাবাদী’, ‘গণতন্ত্রী’ ইত্যাদি কিংবা ইসলাম নামধারী শক্তিসমূহ যে গোপনে প্রকাশ্যে এই শক্তির তাঁবেদার সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। শ্রমিক-কৃষক ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে দেশের গ্রাম শহরের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি শ্রেণী, মধ্যবিত্ত ও উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা গোষ্ঠীই হচ্ছে ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাময় শক্তি। সত্যিকারভাবে এই শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তিই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বাংলাদেশে দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর স্বার্থ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অনুকূল ‘উন্নয়ন’ নীতির কারণে নানাভাবে সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্থ হলেও তাদের অধিকাংশই এখনো পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও তার তাবেদারদের সাথে আপোস করেই নিজেদের অবস্থান বজায় রেখে চলেছে। এর বড় কারণ একদিকে গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য নিজেদের সক্রিয়তার অভাব অন্যদিকে গণতান্ত্রিক শক্তি গড়ে ওঠার সম্ভাবনার প্রতি আস্থাহীনতা। আমার দৃঢ়ভাবে মনে করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেদিকে যাচ্ছে তাতে উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী যদি তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চান এবং দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্র অর্থাৎ জাতীয় অর্থনীতির বিকাশে আগ্রহী হন তাহলে গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশের লক্ষ্যে তাদের যথাসাধ্য সক্রিয় হতে হবে।”

এই প্যারায় ৫ বাম দলের ভাষায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার উপযোগী শ্রেণীশক্তি চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রথমেই বলা দরকার যে, ৫ বাম দল যাদের আদর করে দেশীয় উদ্যোক্তা বলছে তাদের শ্রেণীগতভাবে চিহ্নিত করার বহুল ব্যবহৃত ও সহজ মার্কসবাদী পরিভাষাটি হলো দেশীয় পুঁজিপতি। এই দেশীয় পুঁজিপতি কারা? শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, নির্মাণ, পরিবহণ, হোটেল-রেস্তোরা, ব্যাংক-বীমা, পণ্য বিতরন ও খুচরা বিক্রিয়, মিডিয়া সহ সকল ক্ষেত্রের দেশীয় পুঁজির মালিক পুঁজিপতিগণ। এই পুঁজিপতিদের তারা যা সেই নামে না ডেকে উদ্যোক্তা নামের আড়ালে তাদের শ্রেণীগত অবস্থানকে আড়াল করবার চেষ্টা করেছে ৫ বাম দল। দেশীয় পুঁজিপতিদের তারা হাজির করেছে শ্রমিক শ্রেণীর ঘনিষ্ট মিত্র হিসেবে। পুরো প্যারা জুড়েই জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করবার বদমতলব দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

৫ বাম দল প্রথমে শুধু উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশীয় পুঁজিপতি, অর্থাৎ পুঁজিমালিকদের সেই অংশ যারা সরাসরি শ্রমশক্তি শোষণ করে, তাদেরকে মিত্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। একটু পরেই অবশ্য শুধু উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তার পরিবর্তে সমগ্র দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠীকেই মিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এভাবে সমগ্র দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণীকে, কার্যতঃ বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীকে, ৫ বাম দল তাদের মিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। শুধু মাত্র শাসক শ্রেণীর একটি অংশ, যাদেরকে ৫ বাম দল বলছে ‘শাসকশ্রেণীর ভরকেন্দ্রে অবস্থানকারী গোষ্ঠী’, তাদেরকেই শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। § ১-এ কর্মসূচি প্রণেতারা বলছেন “শাসকশ্রেণীর ভরকেন্দ্রে যে গোষ্ঠীটি অবস্থান করছে, এদের পরিগঠন ও পরিপুষ্টি প্রায় সর্বাংশেই সম্পন্ন হয়েছে অভ্যন্তরীণ লুণ্ঠন এবং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী শক্তি বিশেষভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় শাসক-শোষকগোষ্ঠীর সেবাদাসত্বের মধ্যে।” সুতরাং দেশীয় শাসক শ্রেণী বা দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণী নয়, শাসকশ্রেণীর ভরকেন্দ্রে অবস্থানকারী গোষ্ঠীটিই হলো শত্র“। এদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ভরকেন্দ্রের বাইরে অবস্থানকারী দেশীয় পুঁজিপতিরা তাই ৫ বাম দলের মিত্র।

একইভাবে § ১০-এ আওয়ামী লীগের ‘চালিকা গোষ্ঠীটিকে’ চিহ্নিত করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার হিসেবে। ৫ বাম দলের বিশ্লেষণী কাঠামো অনুসারে আওয়ামী লীগের এই ‘চালিকা গোষ্ঠীটির’ কর্তৃত্ব খর্ব (কর্তৃত্ব খর্বের কথা বলতেই ৫ বাম দল স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে) করতে পারলে এটিও ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার উপযোগী’ সংগঠনে পরিণত হবে।

এভাবে শত্র“-মিত্র চিহ্নিত করার পর বাকি থাকে এমন এক কর্মসূচি নির্ধারন যা ‘শাসকশ্রেণীর ভরকেন্দ্রে অবস্থানকারী গোষ্ঠীটির’ ‘সকল ক্ষমতা অপসারণ’ করবে। যে কর্মসূচি বাংলাদেশে লুণ্ঠনের নৈরাজ্যের বদলে স্থাপন করবে পুঁজিবাদী শোষণের শৃঙ্খলা, কায়েম করবে ‘দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর’ শাসন। যে কর্মসূচি বাংলাদেশে বিরাজমান লুণ্ঠন, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের হাত থেকে বুর্জোয়া সম্পত্তি সম্পর্ক ও পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক রক্ষা করবে। এদেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে রক্ষার এমন কর্মসূচি পুঁজিবাদী সংস্কারের কর্মসূচি ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে? ঠিক তেমন এক কর্মসূচিই হাজির করেছে ৫ বাম দল। ৫ বাম দলের পতাকায় তাই জ্বলজ্বল করছে ‘বিপ্লব নয়, সংস্কার’।

৫ বাম দলের বুর্জোয়া শ্রেণীর তাবেদারির এই হলো চেহারা।

বুর্জোয়াদের তাবেদারি করতে গিয়ে শ্রমিক, কৃষক আর পুঁজিপতিকে একক শ্রেণী হিসেবে চিহ্নিত করে ৫ বাম দল বলছে: “শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি শ্রেণী, মধ্যবিত্ত ও উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক উদ্যোক্তা গোষ্ঠী ……. এই শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তিই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” এই শ্রেণী সমূহের নয়, বলা হচ্ছে এই শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তির কথা।

শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও দেশীয় পুঁজিপতি প্রত্যেকেরই স্বতন্ত্র শ্রেণী স্বার্থ রয়েছে। শ্রমিক শ্রেণী ও দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণী উভয়ের শ্রেণী স্বার্থ পরস্পরবিরোধী, যার ফয়সালা হতে পারে দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণীর উচ্ছেদে, যে ফয়সালাটা করতে হবে খোদ শ্রমিক শ্রেণীকেই। এই ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি শ্রমিক শ্রেণীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সেই চূড়ান্ত ফয়সালার দিকে নজর রেখে কর্মসূচি নির্ধারণ করা যেখানে বিপ্লবীদের কর্তব্য সেখানে বিপ্লবী হিসেবে ভান করা ৫ বাম দল শ্রমিক ও পুঁজিপতির মধ্যেকার সব বিরোধ এড়িয়ে গিয়ে তাদের মাঝে ঐক্য স্থাপন করতে চাইছে। কথার বহু মারপ্যাঁচ সত্ত্বেও এটাই হলো তাদের রণনৈতিক লাইন। বটেই তো, মার্কস-এঙ্গেলস্ই তো বলেছেন, “বুর্জোয়াদের মনে যাতে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা না থাকে, সেজন্য তাদের কাছে স্পষ্টভাবে এবং সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে, লাল জুজু সত্যই জুজু মাত্র, তার কোন অস্তিত্বই নেই। ……. উঠিয়ে দাও শ্রেণী-সংগ্রাম, তাহলে বুর্জোয়া ও ‘সমস্ত স্বাধীন লোক’ ‘প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে যেতে আর ভয় পাবে না’।” (বেবেল, লিবক্লেখত, ব্রাকে প্রমুখের কাছে মার্কস ও এঙ্গেলসের পত্র, ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৯)

এভাবে শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও দেশীয় পুঁজিপতি সকলকেই একটি একক শ্রেণী হিসেবে উপস্থিত করবার পর পরই ৫ বাম দলের পক্ষ থেকে হাজির করা হয়েছে তাদের সকলের অভিন্ন শ্রেণী স্বার্থ ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ’। ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের’ ধ্বনি তুলে তারা দেশীয় পুঁজিপতিদের সহায়তা চাইছে। এজন্য দেশীয় পুঁজিপতিদের ‘যথাসাধ্য সক্রিয়’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্যারার অর্ধেক (ঠিক অর্ধেক, ১০ লাইন) ‘দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠির’ প্রশ্নে নিবেদিত।

বর্তমান বাংলাদেশে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের ধ্বনি তুলতে পারে সাধারণভাবে ক্ষুদে বুর্জোয়া বা পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী, বিশেষ করে পেটি বুর্জোয়াদের সেই অংশটি যাদের মধ্যে বড়পুঁজির মালিক হবার আকাংখা রয়েছে, যারা একই সাথে লক্ষ্য করছে সাম্রাজ্যবাদের সাথে সম্পর্ক না থাকলে বড় পুঁজির মালিক হওয়া সম্ভব নয় এবং তেমন সম্পর্ক স্থাপনের মত জায়গা তাদের জন্য আর নেই, কেননা সেই ধরনের সম্পর্ক ১৯৭১ সালের পরই বাংলাদেশের বর্তমান শাসক শ্রেণী স্থাপন করেছে। এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই পেটি বুর্জোয়াদের একাংশ, বাম পেটি বুর্জোয়ারা, এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। তাদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান উপরে উল্লিখিত বঞ্চণার দরুন। বর্তমানে এরা চায় সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব মুক্ত পুঁজিবাদ। কিন্তু সুুযোগ পাওয়া মাত্র এদের একাংশ, বিশেষ করে নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদের সাথে রফা করতে প্রস্তুত।

৫ বাম দলের কর্মসূচিতে বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী সাহায্য সংস্থা বা এনজিও-র তৎপরতা নিষিদ্ধ করা বা তাদের পুঁজি ও সম্পত্তি জাতীয়করণের কোন কথাই যে বলা হয় নি তা খামোকা নয়। এর মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী এই মহলটির জন্য নিজেদের রাজনীতির দরজা খুলে রেখেছে তারা।

৩.

৫ বাম দলের বিবেচনায় দেশীয় পুঁজিপতিরা ‘সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্থ’। তারা ‘সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, তাবেদারদের সাথে আপোস করেছে’। আপোসের কারণ ‘গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য তাদের সক্রিয়তার অভাব’, এরা ‘গণতান্ত্রিক শক্তি গড়ে ওঠার সম্ভাবনার প্রতি আস্থাহীন’। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে দেশীয় পুঁজিপতিরা ‘সক্রিয়’ নয়, ‘আস্থাহীনতায়’ ভুগছে। দুই-ই বিষয়ীগত (subjective) সমস্যা- বুঝের অভাব, সাহসের অভাব, নেতৃত্বের অভাব, উপযুক্ত নীতির অভাব।

দেশীয় পুঁজিপতিরা কেন সাম্রাজ্যবাদের সাথে হাত মিলায়, তার অধীনতা মেনে নেয় এই-ই হলো তার ৫ বাম দলীয় ব্যাখ্যা। তাদের কাছে দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণীর কোন অতীত নেই, এদের বিকাশের কোন ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা নেই, উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদের সাথে এদের গড়ে ওঠার কোন সম্পর্ক নেই। যেহেতু এরা ‘সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্থ’’ সেহেতু তারা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার হাত থেকে মুক্তি চায়। ৫ বাম দলের গোপন আশা উপযুক্ত কর্মসূচি পেলেই দেশীয় বুর্জোয়ারা তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়াবে। সেই আশাতেই তাদের এই কর্মসূচি।

৫ বাম দলের বক্তব্য হলো, যদি “বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেদিকে যাচ্ছে তাতে উৎপাদন ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠী যদি তাদের নিজেদের স্বার্থরক্ষা করতে চান” তাহলে তাদের কর্তব্য হচ্ছে “গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশের লক্ষ্যে সক্রিয় হওয়া।” সোজা কথায় নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থরক্ষায় দেশীয় বুর্জোয়াদের উচিৎ ৫ বাম দলকে সমর্থন করা, ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের’ কর্মসূচি গ্রহণ করা। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে? কোন ভবিষ্যতের হাত থেকে দেশীয় পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে? তারা কি বিপ্লবের হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে চায়? নাকি বিপ্লবের মাঝেই নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পায়?

বিপ্লবের বিজয় নয়তো প্রতিবিপ্লবের জয়- এই হলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রশ্নটি কেবল এভাবেই উত্থাপন করা চলে। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে একটি সফল বিপ্লব বাংলাদেশে সকল সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি ও দেশীয় সকল বৃহৎ পুঁজি বাজেয়াপ্ত করবে, মাঝারি ও ছোট পুঁজির ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে সীমিত করবে, শ্রেণী সংগ্রামকে অবাধে বিকশিত করবার সুযোগ সৃষ্টি করবে, রাষ্ট্র ও সমাজে শ্রমিক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণ হবে ক্রমবর্ধমান- সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যা শেষ পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের রূপ নেবে। কোন সন্দেহ নেই যে দেশীয় পুঁজিপতিরা এমন ভবিষ্যৎ চায় না।

সুতরাং দেশীয় পুঁজিপতিদের ‘নিজেদের স্বার্থটা’ শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবে রক্ষিত হবে না। তাদের স্বার্থটা হলো বড় জোর স্বাধীন জাতীয় পুঁজি হিসেবে শোষণ চালানো, পুঁজির আনুপাতিক হারে মোট জাতীয় উদ্বৃত্ত মূল্যের অংশীদার হওয়া, সেখানে যাতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সাথে প্রতিযোগিতায় পড়তে না হয় তা নিশ্চিত করা। এ জন্য তাদের সর্বোচ্চ কর্মসূচি হতে পারে বাজার সংরক্ষণের কর্মসূচি, শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সামাজিক বিপ্লব নয়। সে জন্যই ৫ বাম দল বিপ্লবের পরিবর্তে হাজির করেছে ‘জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের’ কর্মসূচি।

৫ বাম দলের ‘জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের’ কর্মসূচি মূলতঃ অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদেরই কর্মসূচি, যার সারবস্তু হলো দেশীয় পুঁজিপতিদের জন্য আভ্যন্তরীণ বাজার সংরক্ষণ, এর বেশী কিছু নয়। কিন্তু দেশীয় পুঁজিপতিরা শুধু নিজ দেশের বাজারের জন্য উৎপাদনকে সীমিত রাখবে এমনটি ভাবা নিতান্তই মূর্খতা, ক্রমবর্ধমান পুনরুৎপাদন ও মুনাফার জন্য বৈদেশিক বাজারে তাদের প্রবেশ করতেই হবে। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার সাথে বাহ্যিকভাবে দূরত্ব বজায় রেখে তার হাত থেকে সাময়িকভাবে মুক্ত থাকা গেলেও শেষ পর্যন্ত ‘জাতীয় অর্থনীতিকে’ সেখানেই ফিরে যেতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে সাম্রাজ্যবাদের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সম্পর্কহীন থেকে কোন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই নিজেকে রক্ষা করতে, বেশী দূর অগ্রসর হতে ও বিকশিত হতে পারে না। ৫ বাম দল ঘোষিত ‘জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের’ কর্মসূচি সেই দিক থেকে ঐতিহাসিকভাবে পশ্চাদমুখী।

তবে ৫ বাম দলের এই কর্মসূচিটি মোটেই নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আরো আগেই এমন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তারা শুধু একে বলছে ‘স্বাধীন জাতীয় বিকাশের’ কর্মসূচি। ২০০৩ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সিপিবি-র অষ্টম কংগ্রেসে ঘোষণা করা হয়েছে: “বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীন জাতীয় বিকাশের প্রধান শত্র“ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।” ৫ বাম দল শুধু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বদলে বলছে মার্কিন-ভারত অক্ষ শক্তির কথা, এভাবে তারা সিপিবি ঘোষিত কর্মসূচিটি নিজেদের কন্ঠে ধারণ করেছে।

কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণী এই কর্মসূচির জন্য কেন লড়াই করবেন? বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর প্রয়োজন ‘স্বাধীন জাতীয় বিকাশ’ বা ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ’ তথা দেশীয় পুঁজিপতিদের জন্য বাজার সংরক্ষণ নয়। মজুরী শোষণ উচ্ছেদের লড়াইয়ে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে উপযুক্ত অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার জন্যই বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক গণতন্ত্র, প্রয়োজন নিজেকে শাসক শ্রেণীতে উন্নীত করা। বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর জন্য রাজনৈতিক গণতন্ত্র মানে জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। বর্তমান বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করবে এই জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। এটাই বর্তমান পর্যায়ে বাংলাদেশ বিপ্লবের লক্ষ্য। এই বিপ্লব বাংলাদেশের কৃষকের হাতে তুলে দেবে জমি আর শ্রমিক শ্রেণীর জন্য নিশ্চিত করবে শ্রেণী সংগ্রামকে অবাধে বিকশিত করবার, স্পষ্টতর ও তীব্রতর করে তুলবার সর্ববিধ সুযোগ। শুধুমাত্র এই পথেই বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।

এটাই হলো মার্কসবাদের শিক্ষা।

‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ’-এর কর্মসূচি গ্রহণের অর্থ শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের হাতে সমর্পণ করা। এর অর্থ বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীকে উচ্ছেদের বিপ্লবী লক্ষ্যকে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা, বা যা একই কথা, বাতিল করে দেয়া। ৫ বাম দলের ‘জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের’ এই কর্মসূচিটি হলো শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ বিরোধী, চূড়ান্তভাবে প্রতিক্রিয়াশীল এক ঘৃণ্য কর্মসূচি।

৪.

§ ১২-তে ‘জাতীয় অর্থনীতির’ পক্ষে রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের সূত্র হাজির করা হয়েছে: “শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি শ্রেণী, মধ্যবিত্ত ও দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্র ও দেশীয় উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর স্বার্থ ভিত্তিক ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্যেই এই শক্তির বিকাশের মূল সূত্র নিহিত।”

এখানে শ্রেণী সমূহের সাথে ‘দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্র’-কে এক করে গুবলেট পাকানো হয়েছে- শ্রেণী প্রশ্নকে জোলো করবার, পাতলা করবার দিকে বরাবর ৫ বাম দলের ঝোঁক। তবে আমাদের সমালোচনার জায়গা সেটি নয়। এখানে পরস্পর বিরোধী শ্রেণী সমূহের অভিন্ন স্বার্থ ভিত্তিক সংগ্রামের যে লাইন নির্ধারণ করা হয়েছেতাতে শ্রমিক শ্রেণীকে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম স্থগিত করতে হয়। আশা করা যায় দেশীয় পুঁজিপতিরা এর বিনিময়ে শ্রমিকদের মনুষ্যোচিত জীবন যাপনের উপযুক্ত মজুরী দেবে! জাতির বৃহত্তর স্বার্থে, জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে দেশীয় পুঁজিপতিদের এই সদিচ্ছা জাগ্রত হবে! শ্রমিকদের এ জন্য কোন সংগ্রামের প্রয়োজন হবে না!!

আবারো, যে একক স্বার্থ ভিত্তিক ধারাবাহিক সংগ্রামের কথা বলা হচ্ছে, সেটি কী? তা হলো ‘দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্রকে’ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে রক্ষা করা। সোজা কথায়, শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী শ্রেণী সমূহের কর্তব্য হচ্ছে দেশীয় পুঁজিপতিদের রক্ষা করা, বাঁচিয়ে রাখা যাতে সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা তাদের শোষণের ক্ষেত্রটা ‘সংকুচিত ও ক্ষতিগ্রস্থ’’ না হয়। বাংলাদেশের শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী শ্রেণী সমূহের জন্য এই কর্তব্যই নির্ধারণ করেছে ৫ বাম দল।

৫.

কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

৭ দফা কর্মসূচির প্রথম দফাতেই “সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ, দেশীয় উদ্যোক্তা ও উৎপাদকগোষ্ঠীর স্বার্থোপযোগী সংবিধান প্রণয়ন” এর কর্মসূচি হাজির করেছে ৫ বাম দল। ৫ বাম দলের কাঙ্খিত সংবিধান শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি শ্রেণী সমূহ এবং দেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণী সকলেরই স্বার্থ রক্ষা করবে। একই সংবিধান পরস্পর বিরোধী শ্রেণী সমূহের স্বার্থ কী করে সমভাবে প্রতিফলিত করতে পারে? কিভাবে শ্রমিক শ্রেণী ও দেশীয় পুঁজিপতি উভয়েরই স্বার্থ একই সংবিধানের অধীনে সমভাবে রক্ষা পেতে পারে?

বৈষয়িকভাবে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনগণের ভোগের বৃদ্ধিতে। অপর দিকে দেশীয় পুঁজিপতিদের স্বার্থ মুনাফার নিশ্চয়তায়। মুনাফার জন্য উৎপাদন এই হলো দেশীয় পুঁজিপতিদের লক্ষ্য। শ্রমজীবী জনগণের ভোগের বৃদ্ধি তার কাছে ততটুকুই প্রাসঙ্গিক যতটুকু মুনাফা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। শ্রমজীবী জনগণের ভোগের মাত্রা কোনক্রমেই সেই সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে না যাতে করে পুঁজিপতির ‘যুক্তিসঙ্গত’ মুনাফায় টান পড়ে।

সংবিধানে দেশীয় পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা মানে সাংবিধানিকভাবে তার শোষণের স্বার্থ, শোষণের অধিকার রক্ষা করা। সাংবিধানিকভাবে পুঁজিপতির মুনাফার অধিকার রক্ষা করা। দেশীয় পুঁজিপতিদের এই স্বার্থ রক্ষা করতে হলে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী সংগ্রামকে ছেঁটে ফেলতে হবে, বাতিল করতে হবে শ্রেণী সংগ্রামকে। সুতরাং নতুন সংবিধান হবে আবশ্যিকভাবে একটি বুর্জোয়া সংবিধান, সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার বাণী সেখানে থাকবে ঠিকই, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীকে তা ঠেলে ঢোকাবে বুর্জোয়া পার্লামেন্টের খোঁয়াড়ে।

বাম পেটি বুর্জোয়ারা সমাজতন্ত্রকে নিছক উৎপাদনের ন্যায় সঙ্গত বন্টনের একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখে। মুনাফার অধিকার সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদানের মাধ্যমে সেখান থেকেও পিছু হটেছে ৫ বাম দল।

নতুন সংবিধানের কথা ৫ বাম দল বলছে বটে, কিন্তু ফের সেই পুরনো সংবিধানেই তারা ফিরে গিয়েছে। পায়ের পাতা তাদের পেছন দিকে ঘুরানো। যতই তারা সামনে এগুতে চায় ততই তারা পশ্চাদগামী।

৬.রাষ্ট্র ও একনায়কত্বের প্রশ্নে মার্কসবাদের বিকৃতি

৫ বাম দল ভুক্ত দলগুলির নেতৃত্ব সাধারণভাবে নিজেদের মার্কসবাদী হিসেবে দাবি করে থাকেন। কিন্তু তাঁদের কর্মসূচিটিতে তাঁরা চোখ বুঁজে মার্কসবাদের বিকৃতি ঘটিয়েছেন।

§ ১২ থেকে: “বিদ্যমান রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইন এবং লুটেরা মাফিয়া গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব খর্ব না করে কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরী হতে পারে না।”

– ঘুরিয়ে বললে, বিদ্যমান রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব খর্ব করে, বিদ্যমান রাষ্ট্র উচ্ছেদ করে নয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্ভব। মার্কসবাদকে এখানে দুই দিক থেকে বিকৃত করা হয়েছে।

প্রথমতঃ বিদ্যমান রাষ্ট্র হলো বুর্জোয়া শ্রেণীর একনায়কত্ব। বিদ্যমান গণতন্ত্র হলো বুর্জোয়া শ্রেণী দ্বারা বুর্জোয়া শ্রেণীর জন্য গণতন্ত্র। বল প্রয়োগের ওপরই এই একনায়কত্ব, এই গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে। বুর্জোয়াদের এই একনায়কত্বকে ৫ বাম দল নিছক শাসন কর্তৃত্বের একটি অবস্থা হিসেবে দেখছে। একনায়কত্বের অর্থ যে বল প্রয়োগ তা আর থাকছে না। মার্কসবাদের এই বিকৃতির ফলে শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের সমস্যা দাঁড়ায় নিছক ‘গণতন্ত্রের’ অধীনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সমস্যা।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ঠিক এই বিকৃতিই করেছিলেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতা, জার্মান পার্টির নেতা কার্ল কাউৎস্কী। কাউৎস্কীর সমালোচনা করতে গিয়ে লেনিন তাঁর সর্বহারা বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউৎস্কী গ্রন্থে লিখেছেন, “একনায়কত্বকে ‘শাসন-কর্তৃত্বের অবস্থা’ (খোদ পরবর্তী ২১ পৃষ্ঠাতে তিনি এই আক্ষরিক অর্থেই তা ব্যবহার করেছেন) বলে ব্যাখ্যা করা কাউৎস্কী প্রয়োজন মনে করেছেন, কারণ তাহলে বৈপ্লবিক বলপ্রয়োগ, বলপ্রয়োগ ভিত্তিক বিপ্লব অদৃশ্য হয়ে যায়। ‘শাসন-কর্তৃত্বের অবস্থা’ হল এমন একটা অবস্থা যেখানে যেকোনো সংখ্যাগরিষ্ঠই নিজেকে দেখতে পায়… ‘গণতন্ত্রেরই’ অধীনে। এ প্রতারণার বদৌলতে বিপ্লব স্বচ্ছন্দেই অদৃশ্য হয়ে যায়।”

লেনিন স্পষ্টভাবেই বলছেন যে, বুর্জোয়া একনায়কত্বের পরিবর্তে বুর্জোয়া কর্তৃত্বের অবস্থা দেখতে পাওয়ার অর্থই হলো নিজেদের ‘গণতন্ত্রের’ অধীনে দেখতে পাওয়া। ৫ বাম দল ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশের অবস্থা দেখে, যে জন্য তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যই হলো ‘সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বাস্তব পরিস্থিতি ও পরিবেশ তৈরী’ করা। তাদের কাছে বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষকের সমস্যা হলো একটি ‘সত্যিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের’ সমস্যা। রাজনৈতিক মর্মবস্তুর দিক থেকে ৫ বাম দলের কর্মসূচি তাই হলো নির্বাচনী সংস্কারের কর্মসূচি।

দ্বিতীয়তঃ কাউৎস্কী যেখানে একনায়কত্বের সংজ্ঞা দিতে যেয়ে মার্কসবাদের উপরে উল্লিখিত বিকৃতি ঘটিয়েছেন সেখানে ৫ বাম দল একনায়কত্বের প্রশ্নকে একবারেই তুলে দিয়েছে। এবং এখানেই তারা দ্বিতীয় দফা মার্কসবাদের বিকৃতি ঘটিয়েছে।

বুর্জোয়া একনায়কত্ব যদি হয় নিছক বুর্জোয়া কর্তৃত্বের অবস্থা, তাহলে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বও দাঁড়ায় নিছক শ্রমিক শ্রেণীর কর্তৃত্বের অবস্থা। এভাবে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বকে পুরোপুরি বাতিল করে দেয়া হয়েছে।

তত্ত্বগতভাবে ও কার্যক্ষেত্রে সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বের প্রশ্নকে এভাবে বাতিল করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রুশ্চেভ চক্র ও চীনে দেঙ চক্র। সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব মানে শ্রমিক শ্রেণীর কর্তৃত্বের অবস্থা এই তত্ত্ব থেকে যে সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে তা হলো বুর্জোয়া সম্পত্তি সম্পর্ক ও পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একটি দেশ সমাজতান্ত্রিক হতে পারে, এবং শ্রমিক শ্রেণী নিছক সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। ক্রুশ্চেভ চক্রের অনুসারী মণি সিং-মোহাম্মদ ফরহাদের এর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবেই বিবেচনা করতো। এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, ৫ বাম দলের শরীক জাতীয় গণফ্রন্ট আজকের চীনকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে দেঙ চক্রের অনুসারী হয়েছে। সকলেই তারা সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্বকে বাতিল করে দিয়েছে।

মার্কসবাদের ঠিক এই বিকৃতিকারীদের, এই দলদ্রোহীদের সমালোচনা গিয়ে লেনিন বলেছেন:

“সর্বহারা শ্রেণীর বৈপ্লবিক একনায়কত্ব হলো এমন একটা শাসন যা বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণী কর্তৃক বলপ্রয়োগের দ্বারাই অর্জিত এবং রক্ষিত, এমন শাসন যা আইনের বাধা-বন্ধন মুক্ত।

“এই যে-সত্যটি প্রতিটি শ্রেণী-সচেতন শ্রমিকের (যারা জনগণেরই প্রতিনিধিত্ব করে, এবং যারা সেই উচ্চতর স্তরের পেটি-বুর্জোয়া বদমায়েসদের প্রতিনিধি নয় যাদের পুঁজিপতিরা কিনে নিয়েছে উৎকোচ দিয়ে, যেরূপ হল সকল দেশেরই সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদীরা) কাছে দিনের আলোর মতই স্পষ্ট, এই যে-সত্যটি নিজেদের মুক্তির জন্যে সংগ্রামরত শোষিত শ্রেণীসমূহের প্রতিটি প্রতিনিধির কাছে স্বতঃস্পষ্ট, এই যে-সত্যটি হল প্রত্যেক মার্কসবাদীর কাছেই বিতর্কের উর্ধ্বে, সেই সহজ-সরল সত্যটিই কিন্তু ‘জোর করে বের করে নিতে’ হবে মহাপন্ডিত কাউৎস্কীর কাছ থেকে! এর অর্থ কী দাঁড়ায়? দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতারা যে দাসসুলভ মনোবৃত্তি নিয়ে বুর্জোয়াদের পদসেবার ঘৃণ্য মোসাহেব হয়ে দাঁড়িয়েছেন, সেই দাস-মনোবৃত্তিই হল এর অর্থ।” (লেনিন, সর্বহারা বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউৎস্কী)

লেনিনের চেয়ে স্পষ্ট আর কে চিনেছেন এই সব দলদ্রোহীদের?

৭.পার্লামেন্টবাদ; আমলাতন্ত্র উচ্ছেদের পরিবর্তে সংস্কারের কর্মসূচি

১ নং কর্মসূচির খ উপধারা: “সর্বাধিক নিম্নতম খরচের সরকার প্রতিষ্ঠা। ……. বিদ্যমান ঔপনিবেশিক গণবিরোধী প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্রিক কাঠামো ও কর্তৃত্বের আমূল পূনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।”

প্রতিটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবেই সর্বাধিক নিম্নতম খরচের সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিটি ওঠে। ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের অভিজ্ঞতার সারসংকলন করে ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ গ্রন্থে মার্কস লিখেছেন, “ফৌজ ও আমলাতন্ত্র, মোটা খরচের এই দুই খাত দূর করে কমিউন সমস্ত বুর্জোয়া বিপ্লবের সুলভ প্রশাসন ধ্বনিটিকে সত্য করে তোলে।”

কিন্তু কর্মসূচি হিসাবে সর্বাধিক নিম্নতম খরচের সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে আমলাতন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে নতুন প্রশাসন যন্ত্র দিয়ে তার প্রতিস্থাপনের যে কর্মসূচি গ্রহণ বাধ্যতামূলক তা পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছে ৫ বাম দল।

‘সর্বাধিক নিম্নতম খরচের সরকার প্রতিষ্ঠার’ প্রতিশ্র“তি দেয়ার পর তারা ঘোষণা করেছে ‘আমলাতন্ত্রিক কাঠামো ও কর্তৃত্বের আমূল পূনর্গঠন’ এর কর্মসূচি¬। অর্থাৎ আমলাতন্ত্র থাকবে, শুধু তার পুনর্গঠন করা হবে। আমলাতন্ত্রবিহীন রাষ্ট্রের কথা ৫ বাম দল চিন্তাও করতে পারে না। নিজেদের এই কর্মসূচিকে গভীরতা ও গাম্ভীর্য্য দানের জন্য ‘আমূল’ কথাটি জুড়ে দিয়ে তারা বলছে আমলাতন্ত্রের ‘আমূল পূনর্গঠন’ করা হবে; তাহলেও সেটা পুনর্গঠনই অর্থাৎ সংস্কার মাত্র। আমলাতন্ত্রকে তারা স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে ধরে নিয়েছে। আর তাই বিপ্লবের পর আমলাতন্ত্র সংস্কারের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, আমলাতন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করবার যে কোন কর্মসূচি থেকে সযত্নে বিরত থেকেছে।

কোনো রকম প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়াই রাষ্ট্র পরিচালনার ‘স্বপ্ন’ আমরা দেখি না। কিন্তু পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটা ছাড়াই নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব এবং সেটাই হলো প্রকৃত বিপ্লবী পথ। লেনিন তাঁর রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “আমলাতন্ত্রকে তৎক্ষণাৎ, সর্বত্র ও সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করার কথাই উঠতে পারে না। এটা ইউটোপিয়া। কিন্তু পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে চূর্ণ করা ও তৎক্ষণাৎ এমন একটা যন্ত্র নির্মাণ শুরু করা যাতে ক্রমশ সমস্ত আমলাতন্ত্রকেই শূন্যে পরিণত করা সম্ভব হবে- এটা ইউটোপিয়া নয়, এটা কমিউনের অভিজ্ঞতা, এটা হলো বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের প্রত্যক্ষ ও উপস্থিত কর্তব্য।”

লেনিন আরো লিখেছেন, “রাজনৈতিক ক্ষমতা জয় করে শ্রমিকেরা পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে ভাঙবে, তার ভিত্তি চূর্ণ বিচূর্ণ করবে, তার একটি ইঁটও অবশিষ্ট রাখবে না, তার জায়গায় ওই একই শ্রমিক ও কর্মচারী দিয়ে নতুন যন্ত্র বসাবে, কেউ যাতে ফের আমলাতন্ত্রীতে পরিণত না হয় তার জন্য তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেবে, মার্কস ও এঙ্গেলস তা সবিস্তারে নির্দেশ করে গেছেন: ১) শুধু নির্বাচন নয়, যে-কোনো সময়ে প্রত্যাহার; ২) মজুরদের চেয়ে বেশি বেতন নয়; ৩) অবিলম্বে এমন অবস্থায় যাওয়া যেখানে নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের কাজ চালাচ্ছে সবাই, যেখানে সাময়িকভাবে সবাই হয়ে উঠছে ‘আমলা’, ফলে কেউ আর ‘আমলা’ হয়ে থাকতে পারছে না।” (রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

পুনর্গঠন বা সংস্কার নয়, পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে চূর্ণ করা, আমলাতন্ত্রের ভিত্তি চূর্ণ বিচূর্ণ করা, তার একটি ইঁটকেও অবশিষ্ট না রাখা- এই হলো বিপ্লবের কাজ। চূর্ণ বিচূর্ণ আমলাতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত করবে নতুন প্রশাসনিক যন্ত্র, আর নতুন এই যন্ত্র নির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে তৎক্ষণাৎ। এই শিক্ষাই লেনিন দিয়েছেন।

উৎপাদন ব্যবস্থাসহ সমগ্র শাসন ব্যবস্থাকে সংগঠিত ও পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে শ্রমিক-কৃষকের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বুর্জোয়া প্রশাসন ব্যবস্থা ও আমলাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয়- প্রতিটি পর্যায়ে প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচন করা; গ্রামীণ জনগণের ভোটে গ্রাম পরিষদ গঠন; জাতীয়করণকৃত শিল্প-কারখানা ও রাষ্ট্রীয় খামার পরিচালনার জন্য শ্রমিকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ব্যবস্থাপনা পরিষদ গঠন; সকল পর্যায়েই নির্বাচিত ব্যক্তিকে প্রত্যাহারের (recall)) ব্যবস্থা; প্রতিটি ক্ষেত্রেই মজুরের সমান বেতন কার্যকর করা এই-ই হলো আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে জনগণের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বাধীন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রবর্তনের পথ, এই-ই হলো মার্কসবাদ-লেনিনবাদের শিক্ষা। ৫ বাম দল এই মার্কসবাদী শিক্ষার সহস্র হাত তফাতে থেকে বুর্জোয়া পার্লামেন্টবাদী রাজনীতির ধারক হয়েছে।

বুর্জোয়া পার্লামেন্টবাদের অনুসারী কাউৎস্কীর সমালোচনা করে লেনিন লিখেছেন: “গণতন্ত্রের (জনগণের জন্য নয়) সাথে আমলাতন্ত্রকে (জনগণের বিরুদ্ধে) মেলানো বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথার সঙ্গে প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের পার্থক্য কাউৎস্কী একেবারেই বোঝেন নি এ প্রলেতারীয় গণতন্ত্র আমলাতান্ত্রিকতার মূলোচ্ছেদের তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেবে, এবং শেষ পর্যন্ত, আমলাতান্ত্রিকতার পরিপূর্ণ বিলোপ, জনগণের জন্য গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ প্রবর্তন পর্যন্ত সেসব ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে সমর্থ থাকবে।” (রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

লেনিন লিখেছেন: “আমেরিকা থেকে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স থেকে ইংলন্ড, নরওয়ে ইত্যাদি যে-কোনো পার্লামেন্টী দেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন: সত্যিকারের ‘রাষ্ট্রীয়’ কাজ চলে পর্দার অন্তরালে এবং তা চালায় দপ্তর, চ্যান্সেলারি, জেনারেল স্টাফ। পার্লামেন্টগুলোয় কেবল বাক্যবিস্তার চলে ‘সাধারণ লোককে’ ধোঁকা দেবার বিশেষ উদ্দেশ্যে।” (রাষ্ট্র ও বিপ্লব)

বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সাথে আমলাতন্ত্রকে মেলায়। আমলাতন্ত্র স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে শাসন ব্যবস্থাকে পরিচালনা করে, আর বুর্জোয়া গণতন্ত্র আগামী কয়েক বছর শাসক শ্রেণীর কোন্ লোকটি পার্লামেন্টে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে ও তাদের দমন করবে তা স্থির করে। বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথার এই দিকটির দিকে তাকিয়েই মার্কস ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ গ্রন্থে লিখেছেন: “কমিউনকে হতে হত পার্লামেন্টী নয়, কাজের সমিতি, একই সঙ্গে আইনদাতা ও কার্যনির্বাহক…”।

বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথার উচ্ছেদ ও আমলাতন্ত্রকে চূর্ণ বিচূর্ণ করা তাই একই কর্তব্যের দুটি দিক। আমলাতন্ত্রকে চূর্ণ বিচূর্ণ করতে অস্বীকৃতি তাই বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথাকে উচ্ছেদেরই অস্বীকৃতি। আমলাতন্ত্রের যে কোন পুনর্গঠনের কর্মসূচি প্রকৃতপক্ষে বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথাকে মর্মবস্তুতে পুরনো, চেহারায় নতুন রূপে প্রতিষ্ঠারই কর্মসূচি।

আমলাতন্ত্রের প্রশ্নে ৫ বাম দলের কর্মসূচি স্পষ্টতই চালাকীতে ভরা বিপ্লব বিরোধী একটি কর্মসূচি। এ তাদের পার্লামেন্টবাদী রাজনীতিরই সম্পূরক ও সম্প্রসারিত অংশ।

৮.প্রতিক্রিয়াশীল কৃষি কর্মসূচি

গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণী ও স্তরের সাথে শ্রমিক শ্রেণীর সম্পর্ক নির্ধারক মূল নীতি সমূহের প্রতিফলন ঘটে বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচিতে। গ্রামীণ বুর্জোয়া, গ্রামীণ মজুর ও কৃষক- বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এই হলো তিনটি প্রধান শ্রেণী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিপ্লবের কৃষি কর্মসূচি মূলতঃ কৃষক সম্পর্কিত কর্মসূচি। অর্থাৎ কৃষি কর্মসূচি শ্রমিক শ্রেণীর সাথে কৃষক জনগণের সম্পর্ক নির্ধারক। বাংলাদেশ বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণীর ঘনিষ্টতম মিত্র হিসেবে কৃষকদের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়েই বাংলাদেশের মার্কসবাদীরা বিবেচনা করেন।

কৃষি কর্মসূচির কোন পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এখানে করা সম্ভব নয় এবং আমাদের তা উদ্দেশ্যও নয়। তবে ৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচি পর্যালোচনার উদ্দেশ্যেই আমরা প্রথমে বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচির কিছু নীতিগত দিক সংক্ষেপে আলোচনা করবো।

আজকের দিনে বুর্জোয়াদের মুখোমুখি যেসব শ্রেণী দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে শুধু শ্রমিক শ্রেণী হল প্রকৃত বিপ্লবী শ্রেণী। অন্য সকল শ্রেণীই বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চায়; এই ব্যবস্থার অধীনেই নিজ শ্রেণীর জন্য অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থান অর্জন করতে চায়। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণী কখনো যদি অপরাপর শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার কথা বলে তবে তা বলতে পারে কেবল নির্দিষ্ট শর্তাধীনেই। কৃষি কর্মসূচিতে কৃষকের স্বার্থ রক্ষার কথাও আমরা শুধু কিছু শর্তাধীনেই বলতে পারি এবং বলি। এই শর্তগুলো কী? প্রথমত, কৃষি কর্মসূচি গ্রামাঞ্চলে সব ধরনের সামন্ত সম্পর্কের পরিপূর্ণ উচ্ছেদ সাধন করবে। দ্বিতীয়ত, এই কর্মসূচি গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী সংগ্রামের অবাধ বিকাশ ঘটাবে। বিপ্লবী কৃষি কর্মসূচিকে এই দুই শর্ত আবশ্যিকভাবে পূরণ করতে হবে, অর্থাৎ কৃষি কর্মসূচিকে সামন্ত সম্পর্কের অবসান ও শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশের যে রাজনৈতিক লক্ষ্য সেটি অর্জনে সহায়তা করতে হবে। তা না হলে তা হবে প্রতিক্রিয়াশীল অথবা অকেজো একটি কর্মসূচি।

বাংলাদেশ বিপ্লবের কৃষি কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার প্রশ্নটি আসবেই। অনুপস্থিত ভূমি মালিক হলেন সেই ধরনের কৃষি জমির মালিক যিনি নিজ জমিতে কৃষক হিসেবে বা মজুর নিয়োগ করে ফসল উৎপাদন করেন না বা করতে অক্ষম; যার জমি হয় পতিত পড়ে রয়েছে কিংবা যিনি জমি মালিকানার সূত্রে জমির প্রত্যক্ষ ব্যবহারকারীর কাছ থেকে খাজনা আদায় করেন; জমির পরিমাণ কম না বেশি তা এক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার অবসান আমাদের কৃষি বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য। এর মাধ্যমে কৃষিতে খাজনাখোরী উচ্ছেদ হবে এবং কৃষি উৎপাদনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ জমি খোদ কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, জমির খাজনা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, বরং এর মাধ্যমে জমির খাজনা রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত হবে; জমির খাজনা জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা সম্ভব হবে। সুতরাং অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার অবসান চাইলে জমি জাতীয়করণের কথা বলতেই হবে।

এর পরেই যে প্রশ্ন আসে তা হলো জাতীয়করণকৃত জমি কৃষকের হাতে কিভাবে তুলে দেয়া হবে?

কৃষকের হাতে জমি তুলে দেয়ার অর্থ এই নয় যে জমি কৃষকের ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা হবে; এর অর্থ কৃষি উৎপাদনের উপায় জমি সাধারণ মালিকানা হিসেবে কৃষকের কাছে হস্তান্তর করা।

এবারে দেখা যাক ৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচিতে কী আছে।

কর্মসূচি নং ৪ (খ): “কৃষিতে আমূল ভূমি সংস্কারের অংশ হিসেবে সকল অনুপস্থিত ও বৃহৎ ভূমি মালিকানা ও সামন্ত অবশেষের সম্পর্কের অবসান। খোদ কৃষক কিংবা উৎপাদকের হাতে কৃষি জমি হস্তান্তর। খাস জমি এবং অন্যায়ভাবে দখলিকৃত জমি ভূমিহীন ও কৃষিমজুরদের মধ্যে বিতরণ এবং সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদনী কার্যক্রমের যৌথায়ন।”

প্রথম বাক্যটি খুবই দুর্বল, গোলমেলে। একদিকে ‘অনুপস্থিত ও বৃহৎ’ ভূমি মালিকানার অবসানের কর্মসূচি অন্যদিকে ‘সামন্ত অবশেষের সম্পর্কের’ (এর অর্থ যে কী তা কর্মসূচি প্রণেতারাই জানেন!) অবসানের কর্মসূচি। লক্ষ্য ও কর্মসূচিকে এখানে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। কোন বিশেষ উৎপাদন সম্পর্কের অবসান হতে পারে রাজনৈতিক লক্ষ্য, সেটি কী করে কর্মসূচির অংশ হয়?

ভূমি সংস্কারের এই কর্মসূচিতে দুটি ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগে ‘অনুপস্থিত ও বৃহৎ ভূমি মালিকানা’ সম্পর্কে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে ‘খাস জমি ও অন্যায়ভাবে দখলিকৃত জমি’ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই বিভাজন সচেতনভাবেই করা হয়েছে, বিভাজনের উদ্দেশ্য কর্মসূচি থেকেই পরিস্কার। অনুপস্থিত ও বৃহৎ ভূমি মালিকানার অবসান ঘটিয়ে সেই জমি কৃষক ও উৎপাদকের হাতে হস্তান্তরের করা হবে, অপরদিকে খাস জমি ও অন্যায়ভাবে দখলিকৃত জমি ভূমিহীন ও কৃষিমজুরদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। উভয় ক্ষেত্রেই জমি ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হবে, তবে শুধু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অর্থাৎ ভূমিহীন ও কৃষিমজুরদের জমিতে সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদনের যৌথায়ন করা হবে। জমি জাতীয়করণের কোন কর্মসূচি ৫ বাম দলের নেই। জমি ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা হবে বলেই জাতীয়করণের কোন কথা বলা হয়নি।

অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা জানি যে কৃষক, বিশেষ করে ছোট কৃষক তার জমি রক্ষা করতে পারে না; এটা শুধু আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা নয়, প্রতিটি পুঁজিবাদী দেশের ক্ষেত্রেই এটা সাধারণভাবে সত্য। কিন্তু ৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচির লক্ষ্যই হলো জমিতে কৃষকের ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠা।

কিন্তু জমি ব্যক্তিমালিকানায় থাকার অর্থই হলো, জমি ক্রয়ে পুঁজির ব্যবহার। এ প্রসঙ্গে মার্কস তাঁর পুঁজি গ্রন্থের ৩য় খন্ডে (অধ্যায় ৪৭) লিখেছেন: “ছোট জোতের চাষাবাদ, যেখানে এর সাথে জমির স্বাধীন মালিকানা ব্যবস্থা এক হয়, তার থেকে উদ্ভূত একটি সুনির্দিষ্ট ক্ষতিকর দিক হলো, জমি ক্রয়ে কৃষকের পুঁজি বিনিয়োগ।” “জমি ক্রয়ে পুঁজি ব্যয় সেই পুঁজিটুকুকে কৃষি থেকে সরিয়ে নেয়।”

“কৃষি জমি ক্রয়ে মুদ্রা-পুঁজির ব্যয়, তাই, কৃষি পুঁজির বিনিয়োগ নয়। এ হলো ছোট কৃষকরা নিজ উৎপাদনক্ষেত্রে যে পুঁজি নিয়োজিত করতে পারে তা সম পরিমাণে (pro tanto) হ্রাস পাওয়া। এটি তাদের উৎপাদনের উপায় সমূহকে সম পরিমাণে হ্রাস করে এবং তদ্বারা পুনরুৎপাদনের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা সংকীর্ণ করে তোলে। ছোট কৃষককে তা মহাজনের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করে, কেননা এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত ঋণ কমক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। এটা কৃষির জন্য একটা বাধা, এমনকি যখন এমন ক্রয়ের ঘটনা ঘটছে বৃহৎ ভূ-সম্পত্তিতে। এটা প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে অসংগতিপূর্ণ, যে ব্যবস্থা জমির মালিক ঋণগ্রস্থ কিনা সেটা সামগ্রিকভাবে উপেক্ষা করে, তা সেই ভূ-সম্পত্তি সে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকুক বা ক্রয় করুক।”

মার্কস আরো লিখেছেন: “এখানে, ছোট জোতের চাষাবাদে, জমির দাম, যা জমিতে ব্যক্তিমালিকানার একটি রূপ ও ফলাফল, খোদ উৎপাদনের পথে বাধা হিসেবে দেখা দেয়। বৃহৎ জোতের কৃষিতে এবং পুঁজিবাদী কায়দায় পরিচালিত বৃহৎ ভূ-সম্পত্তিতে, মালিকানা একইভাবে বাধা হিসেবে কাজ করে, কেননা তা প্রজা-চাষীদের (tenant farmer) উৎপাদনশীল পুঁজি বিনিয়োগকে সীমিত করে, যা চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তাকে উপকৃত করে না, করে জমির মালিককে।”

সুতরাং ঘোষিত কৃষি কর্মসূচির মাধ্যমে খোদ কৃষকদের সাথেই প্রতারণা করছে ৫ বাম দল। এই কর্মসূচি যেমন ভূমি থেকে কৃষকের পুনরায় উচ্ছেদ হওয়া বন্ধ করবে না তেমনি অনুপস্থিত ভূমি মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বীজও এর মধ্যে নিহিত। এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন গ্রামাঞ্চলে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশে কোন অবদান তো রাখবেই না উল্টো ক্ষুদে মালিক ও মালিকানার স্বপ্ন জিইয়ে রেখে শ্রেণী সংগ্রামের বিকাশে সর্বোচ্চ বাধা সৃষ্টি করবে।

৯.

৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচিতে বৃহৎ ভূমি মালিকানার অবসানের কথা বলা হয়েছে। এ থেকে আমরা ধরে নিতে পারি যে পুঁজিবাদী কায়দায় উৎপাদনশীল বৃহৎ ভূমি মালিকানারও অবসান ঘটানো হবে। যেখানে ৫ বাম দল শিল্প-, বাণিজ্য-, ফিন্যান্স পুঁজিকে সর্ববিধ সহায়তা প্রদানে নতুন সংবিধান প্রণয়নের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সেখানে বৃহৎ ভূমি মালিকানার অবসানের কর্মসূচি কেন?

অন্যায়ভাবে দখলিকৃত জমি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে তেমন জমি ভূমিহীন ও কৃষিমজুরদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। যে জমি অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে, সেটা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র যে-ই করে থাকুক, তা তো মূল মালিকের কাছে যাওয়ার কথা, যেহেতু তা পূর্বে অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছিল। এভাবে মূল মালিকের কাছে জমি ফিরে যাওয়ার পর যদি দেখা যায় যে তাতে অনুপস্থিত বা বৃহৎ ভূমি মালিকানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাহলে ৫ বাম দলের কর্মসূচি অনুসারেই তা কৃষক বা উৎপাদকের কাছে     হস্তান্তর করা হবে; এই জমি ভূমিহীন বা কৃষিমজুরদের কাছে আসবে না, যদি না জমির মূল মালিক নিজেই ভূমিহীন বা কৃষিমজুর হোন।

কৃষি কর্মসূচিতে “মূলধন ও কৃষি উপকরণ সরবরাহের ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানী, এনজিও ও দাদন-মহাজনি আধিপত্যের অবসান” ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। শুধুই আধিপত্যের অবসান; সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানী, এনজিও- সকলেই তারা থাকবে, শুধু আধিপত্যশীল অবস্থানে নয়। আধিপত্যের অবসান বলতে আর কিছু হতে পারে না।

কৃষি কর্মসূচির শেষের দিকে বৃহৎ জলাশয়, হাটবাজার, ঘাট, চারণ ভূমি, বন, পাহাড় ও সড়কের ক্ষেত্রেই কেবল ব্যক্তিমালিকানা ও ইজারা প্রথার অবসান এবং জনগণের সাধারণ সম্পত্তিতে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে এর বিপুল অধিকাংশ বর্তমানেই ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে নেই, তা আছে রাষ্ট্রের হাতে, রাষ্ট্রই তা ইজারা দিচ্ছে এবং জনগণকে এসব ভোগ করতে বাধা সৃষ্টি করছে। কৃষি কর্মসূচিতে ‘জনগণের সাধারণ সম্পত্তিতে রূপান্তরের’ কথা থাকলো বটে তবে সব চাইতে নিরাপদ স্থানে, তাতে সম্পত্তি মালিক শ্রেণীর ভয়ের কিছু নেই।

১০.

৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচি কৃষককে কৃষক হিসেবেই বাঁচিয়ে রাখবেÑ সেই হিসেবে ঐতিহাসিকভাবেই এটি এক পশ্চাদমুখী কর্মসূচি। কিন্তু তাদের কৃষি কর্মসূচির সর্বাপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল দিক হলো জমি কৃষকের ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করে গ্রামাঞ্চলে নতুন করে ক্ষুদে মালিকানা সৃষ্টি করা, যেখানে উৎপাদন উপায়ের উপর উৎপাদকদের সাধারণ মালিকানা প্রতিষ্ঠাই হলো শ্রমিক শ্রেণীর লক্ষ্য।

ফ্রেডারিক এঙ্গেলস্ এ প্রসঙ্গে বলেছেন: “উৎপাদন উপায়ের উপর অধিকার মাত্র দুটি রূপে সম্ভব হয়, হয় ব্যক্তিগত অধিকাররূপে, সমস্ত উৎপাদকদের ক্ষেত্রে এই অধিকার কখনও কোথাও ছিল না এবং শিল্প প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও অসম্ভব হয়ে উঠছে; নতুবা সাধারণের অধিকাররূপে, পুঁজিবাদী সমাজের নিজস্ব বিকাশের মধ্য দিয়েই এই অধিকারের বৈষয়িক ও মানসিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে; এবং সেইজন্যই, প্রলেতারিয়েতকে তার ক্ষমতাধীন সমস্ত উপায় দিয়ে উৎপাদন-উপায়ের উপর যৌথ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।” (ফ্রেডারিক এঙ্গেলস্, ফ্রান্স ও জার্মানির কৃষক সমস্যা)

৫ বাম দলের কৃষি কর্মসূচির উদ্দেশ্য ঠিক তার বিপরীত।

১১.সহিংসতার প্রশ্নে পেটিবুর্জোয়া শান্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গী

কর্মসূচি নং ২ (খ): “….. সহিংসতা ও এবং সন্ত্রাসবাদ দূরীকরণে এর উৎস চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।…. ”

‘সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ’- রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এর উপস্থিতি থেকে ধরে নেয়া যেতে পারে এখানে রাজনৈতিক সহিংসতার কথাই বলা হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদও একটি রাজনৈতিক ক্যাটাগরী। দুটিরই শ্রেণীগত চরিত্র আছে।

শাসক শ্রেণীর দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ, মজুরীর দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলি চালানো, কিংবা পানীয় জল সরবরাহের দাবিতে আন্দোলনরত নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী জনগণ কর্তৃক সরকার দলীয় সংসদ সদস্যকে ধাওয়া এবং লাঠি ও পাটকেল দিয়ে কষে মার লাগানোÑ এর প্রতিটিই রাজনৈতিক সহিংসতা। এই প্রতিটি ঘটনারই শ্রেণীগত ভিত্তি রয়েছে।

শ্রমিক শ্রেণীকে বুর্জোয়া শ্রেণী সর্বদাই কম বেশী সহিংসতা ও সন্ত্রাস দিয়ে দমিয়ে রাখে, আমরা এর বিরোধী। কিন্তু বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর সহিংস বল প্রয়োগের সব রকম পদ্ধতিই আমরা প্রয়োজনে ব্যবহারের পক্ষপাতি। বিপ্লবের সাথে, শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের সাথে সহিংসতার ও সন্ত্রাসের সম্পর্ক আমরা খোলাখুলিই স্বীকার করি। এটা অস্বীকার করবার অর্থ খোদ বিপ্লবকে, শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বকে অস্বীকার করা।

রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও সহিংসতা প্রশ্নে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গীটা পাওয়া যাবে এঙ্গেলসের কর্তৃৃত্ব প্রসঙ্গে প্রবন্ধে: “এসব ভদ্রলোকেরা কখনো কি বিপ্লব দেখেছেন? বিপ্লব হল নিঃসন্দেহেই সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যাপার- যত কর্তৃত্বমূলক হওয়া সম্ভব; বিপ্লব হল এমন একটা কাজ যা দ্বারা জনসাধারণের একাংশ বন্দুক, সঙ্গীন আর কামান মারফত, অর্থাৎ সর্বাপেক্ষা কর্তৃত্বমূলক উপায়ের সাহায্যে তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় অপরাংশের উপর। আর বিজয়ী দলকে অবশ্যই তার শাসন বজায় রাখতে হবে সন্ত্রাসের [terror] মাধ্যমে, যে বিজয়ী দলের অস্ত্র প্রতিক্রিয়াশীলদের মনে সঞ্চার করে ত্রাসের। বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জনগণের কর্তৃত্ব প্রয়োগ না করলে প্যারিস কমিউন কি একদিনের জন্যও টিকে থাকত? এই কর্তৃত্ব যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ করা হয় নি বলে কমিউনকে ভর্ৎসনা করাই বরং উচিত নয় কি?”

আর ৫ বাম দল কিনা ‘জনগণের বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে’ ‘অস্থায়ী বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা’ করে গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসবে সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের উৎস কোথায়!

১২.মজুরি বৃদ্ধির পেটি বুর্জোয়া পথ

শুরুতে মজুরি সম্পর্কে সংক্ষেপে খানিকটা আলোচনা করে নেয়া দরকার।

একজন শ্রমিক শ্রম-শক্তি বিক্রি করে মুদ্রায় যে দাম পান তা তাঁর প্রকৃত মজুরি নয়। প্রকৃত মজুরি হলো এর বিনিময়ে তিনি যে পরিমাণ পণ্য পেতে পারেন।

মুদ্রা মজুরি স্থির থাকলেও যদি আবশ্যিক পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায় তাহলে একজন শ্রমিক আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারবেন। অর্থাৎ তাঁর প্রকৃত মজুরি কমে গেলো, ভোগের পরিমাণ হ্রাস পেলো। আবার ধরা যাক, মুদ্রা মজুরি স্থির আছে কিন্তু বর্ধিত উৎপাদিকা শক্তির ফলে আবশ্যিক পণ্যের দাম কমেছে। একই মজুরি দিয়ে সেই শ্রমিক এখন আগের তুলনায় বেশি পণ্য কিনতে পারবেন। এবারে তাঁর প্রকৃত মজুরি বেড়ে গেলো, ভোগের পরিমাণও বৃদ্ধি পেলো। সুতরাং মুদ্রা মজুরি (nominal wage) আর প্রকৃত মজুরি (real wage) সমান নয়।

কিন্তু মুদ্রা মজুরি আর প্রকৃত মজুরি এই দুইয়ের মধ্যেই মজুরি শব্দটি সীমাবদ্ধ নয়। মজুরি সর্বোপরি নির্ধারিত হয় পুঁজিপতির মুনাফার সাথে সম্পর্কিতভাবে। অন্য কথায়, মজুরি একটি আনুপাতিক, আপেক্ষিক পরিমাণ।

প্রকৃত মজুরি পণ্যের দামের তুলনায় শ্রম-শক্তির দামকে প্রকাশ করে। আর আপেক্ষিক মজুরি (relative wage) প্রকাশ করে শ্রমিকের শ্রম দ্বারা সৃষ্ট নতুন মূল্যে পুঁজির ভাগের তুলনায় সেই শ্রমের ভাগটুকুকে।

প্রকৃত মজুরি স্থির থাকলে বা বৃদ্ধি পেলেও আপেক্ষিক মজুরি কমে যেতে পারে। ধরা যাক, বর্ধিত উৎপাদিকা শক্তির ফলে শ্রমিকের বেঁচে থাকার আবশ্যিক পণ্য সমূহের দাম ২/৩ ভাগ (৬৭%)  হ্রাস পেয়েছে এবং তুলনায় মজুরি হ্রাস পেয়েছে ১/৩ ভাগ (৩৩%)। শ্রমিক এখন আগের তুলনায় অধিক পণ্য কিনতে পারবে, তার ভোগের পরিমাণ বাড়বে, অর্থাৎ তার প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি পেলো। একই সময়ে পুঁজিপতির মুনাফা শ্রমিকের মজুরি যতটুকু হ্রাস পেয়েছে ততটুকুই বেড়ে গেলো। অর্থাৎ শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি বাড়লেও তার আপেক্ষিক মজুরি হ্রাস পেয়েছে এবং পুঁজিপতির মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে। পুঁজিপতির অবস্থান শ্রমিকের তুলনায় আরো শক্তিশালী হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ও সহজবোধ্য আলোচনা পাওয়া যাবে মার্কসের মজুরি-শ্রম ও পুঁজি এবং মজুরি দাম মুনাফা লেখা দুটিতে।

এবারে আসা যাক ৫ বাম দলের মজুরি বৃদ্ধির কর্মসূচিতে।

কর্মসূচি নং ৪ (ঘ)-তে জনগণের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ৫ বাম দল: “জনগণের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে দ্রব্যমূল্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।”

আমরা ধরে নিচ্ছি ‘প্রকৃত আয়’ বলতে প্রকৃত মজুরির কথা বুঝিয়েছে ৫ বাম দল। কঠোরভাবে বা নরমভাবে যেভাবেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হোক না কেন তা দিয়ে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি করা যাবে না। এর দ্বারা শুধু প্রকৃত মজুরি হ্রাসকেই সাময়িকভাবে ঠেকিয়ে রাখা যাবে। আর একটু আগেই আমরা দেখেছি কিভাবে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি পেলেও আপেক্ষিক মজুরি হ্রাস পেতে পারে এবং পুঁজিপতির মুনাফা বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি পেলেও জাতীয়ভাবে সৃষ্ট মোট উদ্বৃত্ত মূল্যে পুঁজিপতির মুনাফার তুলনায় শ্রমিকের মজুরীর অংশ হ্রাস পেতে পারে; যে সময় শ্রমিকের ভোগের বৃদ্ধি ঘটছে ঠিক সে সময়টাতেই শ্রমিকের আপেক্ষিক সামাজিক অবস্থানের অবনতি ঘটছে আর পুঁজিপতির অবস্থান আরো শক্তিশালী হচ্ছে। সুতরাং ৫ বাম দলের এই কর্মসূচি ক্ষেত্র বিশেষে শ্রমিকের ভোগের পরিমাণ যাতে হ্রাস না পায় তার নিশ্চয়তা ছাড়া অন্য কিছু নয়, পুঁজিপতির মুনাফা হ্রাস ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

৫ বাম দলের কর্মসূচি দেখে মনে হয় মজুরী বৃদ্ধির জন্য বা মজুরী হ্রাসের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের আর সংগ্রামের প্রয়োজন হবে না, সরকারি দাম নিয়ন্ত্রণ দপ্তরই শ্রমিকদের হয়ে তা করে দেবে! হয় তারা অতি চালাক, নয়তো এ বিষয়ে তাদের বিশেষ কোন ধারণাই নেই।

১৩.পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সম্পর্কে মার্কস ও এঙ্গেলস্

“[পেটি বুর্জোয়ারা] কেবল বিদ্যমান সমাজকে নিজেদের জন্য যতটুকু সম্ভব সহনীয় ও আরামপ্রদ করার অভিকাঙ্খী। সুতরাং সবকিছুর ওপরে তাদের দাবি আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং করের মূল বোঝাটা বৃহৎ ভূস্বামী ও বুর্জোয়াদের ওপর স্থানান্তর। তাদের আরো দাবি সরকারি ঋণ ব্যবস্থা চালু ও মহাজনী নিষিদ্ধ করে ছোট পুঁজির ওপর বৃহৎ পুঁজির চাপ অপসারণ; আর সামন্তবাদের পরিপূর্ণ অবসান ঘটিয়ে ভূমিতে বুর্জোয়া সম্পত্তি সম্পর্ক চালু। ……

“……… শ্রমিকদের প্রশ্নে সবকিছুর ওপরে একটি বিষয় নিশ্চিত: আগের মতই তাদের মজুরি শ্রমিকই থাকতে হবে। তবে, গণতান্ত্রিক পেটি বুর্জোয়ারা শ্রমিকদের জন্য আরো ভালো মজুরি ও নিরাপত্তা চায়, এবং তা অর্জনের আশা করে রাষ্ট্রীয় চাকুরি বৃদ্ধি ও কল্যাণ ব্যবস্থা মারফত; সংক্ষেপে, তাদের আকাঙ্খা শ্রমিকদের অল্প-বিস্তর ছদ্মবেশী দয়া-দাক্ষিণ্যের ঘুষ দিয়ে আর বিদ্যমান অবস্থাকে সাময়িকভাবে সহনীয় করে তুলে তাদের বিপ্লবী শক্তিকে ভেঙে দেয়া।” (মার্কস ও এঙ্গেলস্, কমিউনিস্ট লীগের কাছে কেন্দ্রীয় কমিটির বক্তব্য, মার্চ ১৮৫০)

“১৮৪৮ সালে যাঁরা বুর্জোয়া গণতন্ত্রী বলে নিজেদের প্রচার করেছিলেন, আজ তাঁরা আনায়াসেই নিজেদের সোশ্যাল-ডেমোক্রাট বলে ঘোষণা করতে পারেন: প্রথমোক্তদের কাছে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র যেমন দুর্লভ সুদুরের বস্তু ছিল, শেষোক্তদের কাছে পুঁজিবাদের উচ্ছেদও ঠিক তেমনই, অতএব, বর্তমান রাজনীতিতে তার মোটেই কোন গুরুত্ব নেই, যতখুশি আপোস, মীমাংসা ও জনহিতৈষা চালানো যায়। প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার মধ্যে শ্রেণী-সংগ্রামের বেলাতেও ঠিক একই ব্যাপার। এই সংগ্রামকে কাগজে-পত্রে স্বীকার করা হচ্ছে, কারণ এর অস্তিত্ব আর অস্বীকার করার উপায় নেই; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে একে চেপে যাওয়া হচ্ছে, জোলো করে দেওয়া হচ্ছে, পাতলা করে দেয়া হচ্ছে। সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি হওয়া চলবে না, বুর্জোয়াদের অথবা অন্য কারও ঘৃণা অর্জন করা তার চলবে না; তার কাজ হবে সর্বোপরি বুর্জোয়াদের মধ্যে জোরালো প্রচার কাজ চালানো। যে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যগুলি দেখে বুর্জোয়ারা ভয় পায় এবং যেগুলি হাজার হোক আমাদের জীবদ্দশায় তো আর লাভ করা যাবে না, সেগুলির ওপর জোর না দিয়ে বরং জোর দেওয়া উচিত পেটি বুর্জোয়া জোড়াতালি সংস্কারের উপর, যা পুরাতন সমাজব্যবস্থার পেছনে নতুন ঠেকা দিয়ে হয়তো অন্তিম চূড়ান্ত বিপর্যয়কে ক্রমে ক্রমে একটু একটু করে যথাসম্ভব শান্তিপূর্ণ অবলুপ্তির পদ্ধতিতে পরিণত করতে পারবে।”(মার্কস ও এঙ্গেলস্, বেবেল, লিবক্লেখত, ব্রাকে প্রমুখের প্রতি ‘সার্কুলার পত্র’, ১৮৭৯)

এভাবেই মার্কস-এঙ্গেলস্ তাঁদের কালে পেটি বুর্জোয়া সামাজিক-গণতন্ত্রীদের সমালোচনা করেছিলেন। আমাদের কালে আমাদের কর্তব্য হলো পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের রাজনৈতিকভাবে উন্মোচিত করা, শ্রমিক শ্রেণী ও শ্রমজীবী জনগণের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র চূর্ণ করা।

[সংস্কৃতি ২০০৯ ফেব্রুয়ারী সংখ্যা থেকে প্রকাশিত]